১৩ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ২৯শে কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, হেমন্তকাল

নুরুল ইসলামের আত্মজীবনী একটি আলোকবর্তিকা

প্রকাশিতঃ জানুয়ারি ২৪, ২০১৮, ১১:০৯ পূর্বাহ্ণ


বইটি শুধু একটি আত্মজীবনী নয়, এটি একটি আলোকবর্তিকাও। চারদিকে যখন হতাশা, তখন এই বই তরুণ প্রজন্মের কাছে অনুকরণীয়। এখানে প্রতিকূল পরিস্থিতি পেরিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক নুরুল ইসলামের অ্যান অডিসি জার্নি অব মাই লাইফ বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে বক্তারা এ কথা বলেন। বক্তারা আরও বলেন, দেশপ্রেমের টানে স্বাধীনতার পরপরই বিদেশে উচ্চ পদের লোভ ছেড়ে দেশে চলে এসেছিলেন। তাঁর জীবন একটি দুঃসাহসী অভিযান। মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নিয়ে অনেক বাধাবিপত্তি পেরিয়ে সফলতা পেয়েছেন।

প্রথমা প্রকাশন থেকে বইটি প্রকাশিত হয়েছে। এই বইয়ে অধ্যাপক নুরুল ইসলাম নিজের ব্যক্তিগত, পেশাগত জীবনসহ বিভিন্ন বিষয়ে স্মৃতিচারণা করেছেন।

সোনারগাঁও হোটেলে অনুষ্ঠিত এই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান। আত্মজীবনীমূলক এই বইয়ের ওপর আলোচনা করেন দেশের খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ, আইনজ্ঞ, সাবেক আমলা এবং অধ্যাপনা জীবনের তাঁর ছাত্ররা।

অধ্যাপক নুরুল ইসলাম বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে বসবাস করেন। তিনি এখন ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (আইএফপিআরআই) ইমেরিটাস রিসার্চ ফেলো হিসেবে কাজ করছেন। এ ছাড়া তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। স্বাধীনতার পর গঠিত পরিকল্পনা কমিশনের প্রথম ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

অনুষ্ঠানে অধ্যাপক নুরুল ইসলামের পক্ষে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন অধ্যাপক রেহমান সোবহান। এতে বলা হয়, শারীরিক অসুস্থতার জন্য এই বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে না পেরে আমি দুঃখিত। বইয়ে চট্টগ্রামের শুরুর জীবন, এরপর কলকাতা, ঢাকা ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের নানা দিক তুলে ধরা হয়েছে। আমার জীবনের দুটি পর্বের বিষয়ে বিশেষভাবে উঠে এসেছে যা আগের লেখাগুলোতে সেভাবে আসেনি। একটি হলো পাকিস্তান উন্নয়ন অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের পরিচালক থাকার সময়। অপরটি হলো জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সহকারী মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালনকালীন। বইটি বর্তমান তরুণ প্রজন্মের কাছে সমাজ, রাজনীতি ও অর্থনৈতিক অবস্থার একটি পরিপূর্ণ চিত্র তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে।

অনুষ্ঠানে অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, ‘নুরুল ইসলাম একজন পরিপূর্ণ অর্থনীতিবিদ। আমি মনে করি, বাংলাদেশের অমর্ত্য সেন (ভারতের নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ) হতে না পারার কোনো কারণ তাঁর ছিল না। তবে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ভূমিকা রাখবেন, নাকি পেশাদার অর্থনীতিবিদ হবেন—এই বিষয়ের দ্বন্দ্ব তিনি সারা জীবনে কাটিয়ে উঠতে পারেননি। এই দ্বন্দ্বের কারণে একজন বিশ্বমানের বাঙালি অর্থনীতিবিদ পাওয়া থেকে বিশ্ব বঞ্চিত হয়েছে বলে আমি মনে করি।’

রেহমান সোবহানের মতে, বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর বিশ্লেষণী ক্ষমতা কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের চেয়ে বেশি। আর্থসামাজিক বিষয়ে তাঁর বিশ্লেষণ অসাধারণ। জীবনের একটি বড় সময় বাংলাদেশের বাইরে কাটানোর পরও তিনি দেশের জন্য গভীরভাবে ভাবেন, চিন্তা করেন। কিন্তু ওয়াশিংটনে বসে তিনি যা ভাবেন, ঢাকায় বসে ভাবতে পারলে তা আরও বেশি ফলপ্রসূ হতে পারত। সবকিছুর পর এই বয়সেও বাংলাদেশকে নিয়ে তাঁর চিন্তা অব্যাহত আছে।

অর্থনীতিবিদ নুরুল ইসলাম সম্পর্কে সাবেক অর্থমন্ত্রী ও সচিব এম সাইদুজ্জামান বলেন, ১৯৯৬ সালের দিকে কিছুদিন দেশে ছিলেন তিনি। তখন স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য বাছাই তালিকায় এক নম্বরে ছিলেন তিনি। স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য বাছাই কমিটির কয়েকজন বলেছিলেন, উনি তো পাঁচ বছরও দেশে থাকেননি। অথচ ওই কমিটির এমন লোকও ছিলেন, যাঁরা বঙ্গবন্ধু হত্যার পর দেশে ফিরেছিলেন।

এম সাইদুজ্জামান আরও বলেন, বাংলাদেশে এমন অনেকে মন্ত্রী হয়েছিলেন। যাঁরা একসময় সচিব ছিলেন, পরে মন্ত্রী হয়েছেন তাঁরা নুরুল ইসলামের প্রতি সদয় ছিলেন না। তাঁকে জানতে হলে নতুন প্রজন্মকে বইটি পড়তে হবে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ও নুরুল ইসলামের ছাত্র এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘তিনি একজন অনুপ্রেরণামূলক শিক্ষক ছিলেন। খুব অল্প বয়সে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। এখন “যোগাযোগ” ছাড়া এ ধরনের নিয়োগ হয় কি না, জানি না।’ তিনি জানান, স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠনে প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা তৈরি করেন নুরুল ইসলাম।

মির্জ্জা আজিজ আরও বলেন, এই বইয়ে তিনি সঠিক পরিকল্পনার জন্য সঠিক তথ্য-উপাত্তের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘আমি ওনাকে দেখি আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাত দেশের প্রধান অর্থনীতিবিদ হিসেবে। ৩০ বছর ধরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে বসবাস করেন। ওখানে বসে প্রতিনিয়ত দেশের খোঁজ রাখেন। তাহলে কেন দেশে আসছেন না, এমন প্রশ্ন আমি ওনাকে করেছিলাম। উত্তরে তিনি বলেন, নীতিনির্ধারকেরা যখন চাইবেন তখনই উপদেশ দেবেন। স্ব-উদ্যোগে দিতে যাবেন না। গত ৩০ বছরে কেউ ওনার কাছে উপদেশ চাননি। যখন যাঁরা ক্ষমতায় ছিলেন, ক্ষমতাসীন নীতিনির্ধারকের একজনের সঙ্গেও সরাসরি আলোচনায় বসার সুযোগ পাননি। একবার তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে ২-৩ পৃষ্ঠার একটি লিখিত পরামর্শ দিয়েছেন। পরে তিনি জেনেছেন, সেটা কেউ পড়েও দেখেননি।’

ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য মনোয়ার উল ইসলাম বলেন, ‘নুরুল ইসলাম অর্থনীতির জটিল তত্ত্বগুলো সহজে বলেন। তাঁর হাত ধরেই অর্থনীতি ও গবেষণা শিখেছিলাম।’ বইয়ের নামকরণের সার্থকতা তুলে ধরে তিনি বলেন, তাঁর জীবন একটি দুঃসাহসী অভিযান। মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নিয়ে অনেক বাধাবিপত্তি পেরিয়ে সফলতা পেয়েছেন। কঠিন পরিস্থিতিতে কঠোর পরিশ্রম করে জয়মাল্য পেয়েছেন। চোখের অসুখ নিয়ে তিনি মেট্রিক পরীক্ষায় প্রথম হয়েছেন।

নিজের জীবন নিয়ে তাঁর আফসোস আছে এমন কথা উল্লেখ করে মনোয়ার উল ইসলাম ওই বইয়ের একটি উদ্ধৃতি দেন। সেটি হলো, ‘কত কাজ নিয়ে সারা জীবন পাগল হয়ে থাকলাম। পরিবার, বন্ধুবান্ধবকে সময় দিইনি। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দুঃখ হয় যে, এটা শুধু চলার পথ, ফেরার পথ নয়।’

উপস্থিত অতিথিদের মধ্যে বক্তব্য দেন ড. কামাল হোসেন। তিনি বলেন, ‘১৯৫৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলেন নুরুল ইসলাম। তখন শিকাগোতে পাকিস্তানের ছাত্র সম্মেলনে গিয়ে দেখলাম, উপস্থিত শতাধিক ছাত্রের মধ্যে চার-পাঁচজন বাঙালি। তখন এই বৈষম্য নিয়ে আমরা দুজন আলোচনা করেছিলাম। পরে রেহমান সোবহান পেশাগতভাবে অর্থনৈতিক বৈষম্য তুলে ধরেন। পশ্চিমা শাসকেরা তখন কোনো উত্তর দিতে পারেননি।’

কামাল হোসেন বলেন, ‘পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু ও আমি যখন লন্ডনে আসলাম, তখন বঙ্গবন্ধু বললেন, অর্থনৈতিক উন্নয়নে নুরুল ইসলামকে লাগবে। আমি তখন নিউইয়র্কে ফোন করে জানলাম, ইতিমধ্যে তিনি বাংলাদেশে পৌঁছে গেছেন। বঙ্গবন্ধু তাঁকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি রাজি হননি। তাঁকে পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান করা হয়।’

বিশিষ্ট লেখক মঈদুল হাসান বলেন, ‘ইতিহাস আবার পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। কেননা আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রতারিত করতে পারি না।’

অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান। তিনি বলেন, ‘২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। তখন তাঁর (নুরুল ইসলাম) সঙ্গে দেখা হয়। তখন তাঁকে আত্মজীবনী লেখার অনুরোধ করি। গত দুই বছর ধরে তিনি লেখা পাঠিয়েছেন।’

এ অনুষ্ঠানে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহান, সাবেক প্রধান বিচারপতি তাফাজ্জাল ইসলাম, ব্যাংকার খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য শামসুল আলম, সিডিপির মোস্তাফিজুর রহমান, সৈয়দ আবুল মকসুদ, ইকবাল বাহার চৌধুরী, ফয়জুল লতিফ চৌধুরী, শাহেদ লতিফ, অধ্যাপক এম এম আকাশ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

Leave a Reply

৯৭/৩/খ, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬
মোবাইলঃ ০১৭১২-৬৪৩৬৭৩, বার্তা বিভাগঃ ০১৭১২-৬৪৪৩৫০, সার্কুলেশন বিভাগঃ০১৯১৬০৯৯০২০
ইমেইলঃ [email protected], [email protected]

সম্পাদক:
মোঃ সুলতান চিশতী

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ
মহসিন হাসান খান (বুলবুল)

নির্বাহী সম্পাদকঃ
মোঃ ইব্রাহিম হোসেন

সহকারী সম্পাদকঃ
মোঃ আতোয়ার হোসেন

আইন উপদেষ্টাঃ
শাহিন সরকার


.: Developed By :.
Great IT