২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ১১ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, শরৎকাল

নির্জন বনে দরবেশের পরীক্ষা

প্রকাশিতঃ জানুয়ারি ৬, ২০১৮, ১২:২০ পূর্বাহ্ণ


তুমি যদি তোমার অন্তরে আধ্যাত্মিক আকর্ষণ, ওই জগতের হাতছানি অনুভব করো, তাহলে আনন্দিত হও। রূপকথার বিহঙ্গমা পক্ষীর মতো ডানা মেলে সেদিকে উড়াল দাও। কারণ এ আকর্ষণের অন্য অর্থ, ঊর্ধ্বজগৎ থেকে তোমার প্রতি আহ্বান এসেছে

এক দরবেশ আশ্রয় নিয়েছিলেন গহিন বনে। লোকালয় ছেড়ে নির্জন সাধনায় তার একমাত্র সাথি ছিল নিদ্রা। তার সব প্রয়োজন এবং চাহিদা মিটে যেত আল্লাহর পক্ষ থেকে। তাই মানুষের সংশ্রবে তিনি অস্বস্তিবোধ করতেন। লোকালয়ের স্বাভাবিক জীবন ছেড়ে নির্জন সাধনা কীভাবে কারও ভালো লাগেÑ এ প্রশ্ন অনেকের মনে জাগতে পারে। মওলানা রুমি (রহ.) জবাবে বলেন, যাকে যে কাজের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, সে কাজ তার কাছে ভালো লাগে। কেউ বাড়িতে আরামে জীবন কাটাতে ভালোবাসে। কেউ আনন্দ পায় সফরে, দেশ ভ্রমণের কষ্ট স্বীকারে, এমনকি দুর্গম পর্বতারোহণে। নেতৃত্বের বাতিকে কেউ জীবনের আরাম-আয়েশ ভুলে আনন্দ পায়। আবার কেউ চাষাবাদে সবুজের সমারোহে প্রাণ জুড়ায়। বস্তুত প্রত্যেক মানুষকে একেক কাজের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, আর সেই কাজের আকর্ষণ তার অন্তরে  গেঁথে দেওয়া হয়েছে। সে  কাজেই সে মনের শান্তি পায়। কোরআন মজিদের ভাষায়, ‘বলুন, প্রত্যেকেই নিজ প্রকৃতি অনুযায়ী কাজ করে থাকে এবং তোমার প্রতিপালক চলার পথে কে সর্বাপেক্ষা নির্ভুল তা সম্যক অবগত আছেন।’ (সূরা বনি ইসরাইল : ৮৪)।

মওলানা রুমি বলেনÑ
গর বেবিনী মেইলে খোদ সূয়ে সামা
পররে দওলত বরগুশা হামচোন হুমা
যদি দেখ তোমার মনের আকর্ষণ ঊর্ধ্ব আসমান পানে
বিহঙ্গমার  মতো উড়াল দাও সৌভাগ্যের ডানা মেলে। (১৬২০)।
তুমি যদি তোমার অন্তরে আধ্যাত্মিক আকর্ষণ, ওই জগতের হাতছানি অনুভব করো, তাহলে আনন্দিত হও। রূপকথার বিহঙ্গমা পক্ষীর মতো ডানা মেলে সেদিকে উড়াল দাও। কারণ এ আকর্ষণের অন্য অর্থ, ঊর্ধ্বজগৎ থেকে তোমার প্রতি আহ্বান এসেছে। তাই সে আকর্ষণে তুমি আকৃষ্ট হচ্ছ। এমন যে কোনো কাজ থেকে বিরত থাক, যার কারণে সেই আকর্ষণ ব্যাহত হয়। পক্ষান্তরেÑ
ওয়ার বেবিনী মেইলে খোদ সূয়ে যমীন
নওহে মী কুন হীচ মন্শীন আয হানীন
আর যদি দেখ তোমার ঝোঁক মাটির দিকে
কাঁদো অবিরাম কান্না যেন একটুও না থামে। (১৬২১)।
যদি দেখ যে, তোমার মনের টান দুনিয়ার দিকে, বস্তুগত হীনতা-নীচতা, অপবিত্রতা, অশ্লীলতার দিকে, তাহলে বুঝে নাও যে, তোমার কপাল হয়তো মন্দ। তোমার যাত্রা ধ্বংসের পথে। এ মুহূর্তে তোমার করণীয়, তুমি কাঁদতে থাক, আল্লাহর কাছে মাফ চাও, সাহায্য চাও। মানবিক অধঃপতনের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় তালাশ করো।
হ্যাঁ, প্রত্যেকে নিজের মনের সঙ্গে পরামর্শ করে বুঝতে পারে, নিজে কি আসলে ভালো মানুষ? মানবীয় গুণাবলির প্রতিভা কি তার মধ্যে গচ্ছিত? মনুষ্যত্বের সৌভাগ্য তার নসিব  হবে? নাকি তার মন তাকে মন্দের দিকে, হীনতা, নীচতা, পাপ ও অশ্লীলতার দিকে টানে। সে অবস্থায় অবশ্যই সতর্ক হতে হবে। হতে পারে তার ভাগ্যলিপিতে দুর্ভাগ্য লেখা আছে। এমন  পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য মওলানা রুমির পরামর্শ, তুমি কাঁদো, কান্না জুড়ে দাও, অবিরাম কাঁদো। এ কান্নাই তোমাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাবে আল্লাহর সান্নিধ্যে। তিনি বলছেন, যারা জ্ঞানী ও বিচক্ষণÑ এ ধরনের আলামত দেখে তারা সতর্ক হয়ে যান। আল্লাহর কাছে কাঁদেন, সাহায্য চান। কিন্তু যারা মূর্খ-নাদান, তারা আল্লাহর শরণ না নিয়ে মাথা কুটে, বেসামাল হয়ে হা-হুতাশ করে, অস্থিরতায় কাতরায়। মওলানার আরও পরামর্শ, কোনো কাজ করার আগে তার শেষটা দেখে নাও। যাতে তোমাকে পস্তাতে না হয়। শাস্ত্রে বলা আছে, ‘ভাবিয়া করিও কাজ করিয়া ভাবিও না।’
পরিণতি ভেবে কাজ করার গুরুত্ব প্রমাণের জন্য মওলানা রুমি আরেকটি গল্পের অবতারণা করে বুঝিয়ে বলেন, গণ্যমান্য বুড়ো এক লোক মুটভরা স্বর্ণকণা নিয়ে স্বর্ণের দোকানে গিয়ে বলল, আমাকে একটি নিক্তি দিন, আমার স্বর্ণগুলো মাপতে হবে। স্বর্ণকার বলল, আমার কাছে চালুনি নেই। বৃদ্ধ বলে, আমি তো চালুনি চাইনি, স্বর্ণ মাপার নিক্তি চাচ্ছি। দোকানদার বলল, আমার কাছে ঝাড়– নেই। বুড়ো বলল, আপনি কিনা শোনার ভান করছেন? নাকি আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করছেন? আমি চেয়েছি স্বর্ণ ওজন দেয়ার নিক্তি, আপনি একবার বলেন চালুনি নেই আবার বলেন ঝাড়– নেই। কী পেয়েছেন আমাকে? স্বর্ণকার বলল, আমি বধির নই। আপনার কথা শুনিনি এমনও নয়। কিন্তু দেখছি, আপনার হাত কাঁপছে। আপনার পারকিনশন রোগ। কাজেই নিক্তি যদি আপনার হাতে দেই, স্বর্ণের টুকরোগুলো মাটিতে পড়ে যাবে। তখন বলবেন, একজন ঝাড়–দারকে ডাকুন। স্বর্ণকণাগুলো কুড়িয়ে দিক। আর চালুনির ব্যবস্থা করো। মাটি ছেকে স্বর্ণকণাগুলো আলাদা করে দাও। কাজেই আমি আগে থেকেই আপনার অবস্থা দেখে বুঝেছি, আপনাকে আমার নিক্তি দিলে সমস্যা আছে। এ গল্পে বুড়ো লোকটি সাধারণ মানুষের রূপক আর স্বর্ণকার দিব্যদৃষ্টির বুজুর্গের উপমা। মওলানা বুঝাতে চান, বুজর্গ লোকেরা কথা বলেন ইশারায়। তারা সৃষ্টিলোকে বিরাজিত গুপ্ত রহস্য ফাঁস করেন না। কারণ, তা আল্লাহর আমানত। তাই ইশারায় কথা বলেন। অথচ গল্পের বুড়োর মতো দুনিয়াদাররা তাদের ইশারার মর্ম বোঝে না।
মওলানা বনে নির্জনে ইবাদতে নিমগ্ন দরবেশের প্রসঙ্গে ফিরে এসে বলেন, সেই বনে ছিল ঘন ছায়াদার ফলদ গাছ। পেয়ারা সদৃশ গোলাবির সারি সারি বাগান। সেখানেই ধ্যানমগ্ন দরবেশের অবস্থান। দরবেশের খায়েশ জাগল, রিজিকের ব্যাপারে আল্লাহর সঙ্গে বোঝাপড়া করবেন। বললেন, প্রভু হে! সাধনার পথে তোমার সঙ্গে একটি অঙ্গীকার করতে চাই। আমি প্রতিজ্ঞা করছি, নিবিড় ফলদ গাছের কোনো ফল হাতে ছিঁড়ব না। ক্ষিদায় আক্রান্ত হলেও নিজ হাতে পেড়ে ফল খাব না। যে ফল গাছ থেকে ঝরে পড়বে তা নিয়েই ক্ষুণিœবৃত্তি করব। কিছুদিন এই অঙ্গীকারের ওপর চলল দরবেশ। কিন্তু  তকদিরের অগ্নিপরীক্ষার সময় উপস্থিত হলো। কারণ ছিল, দরবেশ তার অঙ্গীকারে ইনশাআল্লাহ (আল্লাহ চাহেন তো) বলেননি। এ জন্য আল্লাহর নির্দেশ হলো, তোমার ভাবিষ্যৎ পরিকল্পনায় অবশ্যই ইনশাআল্লাহ বল। তোমার সামর্থ্যকে তার ইচ্ছার ওপর সোপর্দ করো। তোমার কাজের সঙ্গে তার শক্তিকে যুক্ত করো। কারণ আল্লাহর ইচ্ছা ও ক্ষমতা তোমার আয়ত্তে নয়। তিনি প্রতিক্ষণে ভিন্ন ভিন্ন শানে থাকেন। তোমার দিলে তিনি প্রতি মুহূর্তে নতুন নতুন ভাবের উন্মেষ ঘটান। ‘কুল্লা ইয়াউমিন হুয়া ফি শান’ (প্রতিদিন তিনি একেক অবস্থায় থাকেন)। (সূরা আর রহমান :২৯)। মওলানা আরবি কবিতায় বলেনÑ
কুল্লু ইসবাহিন লানা’ শানুন জদীদ
কুল্লু শাইয়িন আন মুরাদী লা ইয়াহীদ
প্রতিদিন ভোরে আমার জাগে নতুন নতুন অবস্থা,
যা কিছু ঘটে অতিক্রম করতে পারে না আমার ইচ্ছা। (১৬৪০)।
বিষয়টির নাজুকতা বোঝানোর জন্য মওলানা আরও বলেন, হাদিসে বর্ণিত মানুষের দিল পাখির পালকের মতো, ঝরে পড়া পালক মরুবিয়াবানে ঝড়ের কবলে ওলটপালট হতে থাকে। হালকা পালকটিকে বাতাস যেদিকে ইচ্ছা ডানে, বামে, সামনে পেছনে নিয়ে যায়। তোমার দিলের অবস্থাও অনুরূপ।
অপর হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী, মানুষের অন্তর নিত্যপরিবর্তনশীল। ডেকচির মধ্যে ফুটন্ত পানির মতো, যা টগবগ করে। প্রতি মুহূর্তে মনে একেক কল্পনার আনাগোনা চলে। মওলানা বলেন, এই ওলটপালট, কল্পনা ও চিন্তার বিবর্তন নিজ থেকে নয়। বরং অন্য কোনো টানে এমনটি হয়। কাজেই মনের চিন্তা ও কল্পনার ওপর তুমি কীভাবে অত বেশি আস্থাশীল হলে। কীভাবে মনে করলে যে, তোমার মনের অবস্থা, ভাব, চিন্তা অপরিবর্তিত থাকবে; অথচ পরে তোমাকে লজ্জিত ও অনুতপ্ত হতে হবে। তাই ইনশাআল্লাহ বলাই যে কোনো অযাচিত পরিস্থিতির রক্ষাকবচ। জেনে রেখো, মনের ভাবের এ পরিবর্তন তকদিরেরই ফয়সালা। বিচক্ষণ পাখি দেখে যে ফাঁদ পেতে খাবার ছড়িয়ে শিকারি তার অপেক্ষায় আছে, এরপরও লোভের বশে তার সতর্কতা মার খেয়ে যায়। চোখ-কান খোলা থাকা সত্ত্বেও শিকারির পাতানো জালে আটকে যায়। তকদিরের ফয়সালা তাকে করুণ পরিণতির দিকে নিয়ে যায়।
কোনো এক শাহজাদা এমন রূপসী নারীর ফাঁদে আটকে গেল, যে কিনা বংশমর্যাদায় বা যে কোনো বিবেচনায় রাজবংশের জন্য কলঙ্ক। ঘরবাড়ি রাজত্বের মায়া ছেড়ে এমন নারীর পেছনে দৌড়াতে গিয়ে শাহজাদা সর্বস্বান্ত হয়ে যায়। পরে সম্বিত ফিরে পেলে বুজুর্গ লোকের কাছে গিয়ে ধরনা দেয়, হুজুর আমাকে দোয়া করুন। আমার জন্য তদবির বাতলে দিন। মনের আসক্তির বন্দিত্ব থেকে আমায় রক্ষা করুন। মওলানা বলেন, শাহজাদার এ বন্দিদশা তার তকদিরের ফয়সালা। এর থেকে উদ্ধার পাওয়ার পথ তারাই জানে, যারা আল্লাহওয়ালা। তাদের কাছেই দিব্যজ্ঞানের মশাল আছে।

(মওলানা রুমির মসনবি শরিফ
তৃতীয় খ-, বয়েত : ১৬১৪-১৬৭১)

Leave a Reply

৯৭/৩/খ, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬
মোবাইলঃ ০১৭১২-৬৪৩৬৭৩, বার্তা বিভাগঃ ০১৭১২-৬৪৪৩৫০
ইমেইলঃ [email protected], [email protected]

সম্পাদক:
মোঃ সুলতান চিশতী

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ
মহসিন হাসান খান (বুলবুল)

নির্বাহী সম্পাদকঃ
মোঃ ইব্রাহিম হোসেন

সহকারী সম্পাদকঃ
মোঃ আতোয়ার হোসেন

আইন উপদেষ্টাঃ
শাহিন সরকার


.: Developed By :.
Great IT