১৫ই ডিসেম্বর, ২০১৮ ইং | ১লা পৌষ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, শীতকাল

নবীপ্রেমের উজ্জ্বল নমুনা আবু আইয়ুব আনসারি (রা.)

প্রকাশিতঃ ডিসেম্বর ৬, ২০১৮, ১২:১৪ পূর্বাহ্ণ


প্রসিদ্ধ সাহাবি আবু আইয়ুব আনসারি (রা.) এর আসল নাম খালেদ। তিনি মদিনার অভিজাত খান্দান বনু নাজ্জার কবিলায় জন্মগ্রহণ করেন। এ খান্দান রাসুলুল্লাহ (সা.) এর মাতুল বংশ হওয়ায় তার মর্যাদা ও আভিজাত্য আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। আবু আইয়ুব আনসারি (রা.) ছিলেন এ কবিলার রইস বা সরদার। তিনি নবুয়তের দ্বাদশ বছরে হজ উপলক্ষে মক্কায় এসে ‘আকাবার তৃতীয় বাইয়াতে’ অংশগ্রহণ করেন এবং রাসুলুল্লাহ (সা.) এর হাতে হাত রেখে কালেমা পড়ে মুসলমান হন। আকাবার এ শেষ অনুষ্ঠানেই রাসুলুল্লাহ (সা.) কে মদিনায় গমনের আমন্ত্রণ জানানো হয়।

আবু আইয়ুব আনসারির বাড়িতে আল্লাহর রাসুল
মদিনাবাসীর আমন্ত্রণে আল্লাহর নির্দেশ পেয়ে মহানবী (সা.) নবুয়তের ত্রয়োদশ বছরে প্রিয় সাহাবি আবুবকর সিদ্দিককে সঙ্গে করে মদিনার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েন। এ দিকে মদিনাবাসী অধীর আগ্রহে মহানবী (সা.) এর আগমনের অপেক্ষা করছিলেন। আনসারদের একটি দলের সঙ্গে আবু আইয়ুব আনসারি (রা.) প্রতিদিন মদিনা থেকে ৪-৫ মাইল দূরে ‘হাররা’ নামক স্থানে এসে রাসুলের আগমনের পথে তাকিয়ে থাকতেন। একদিন তাদের অপেক্ষার অবসান হলো। এক ইহুদি মহানবীর আগমনের সুসংবাদ দিলে আনসাররা অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে রাসুল (সা.) স্বাগতম জানানোর জন্য দ্রুত ছুটে যায়। বনি নাজ্জার ছিল তাদের অগ্রগামী। মহানবীর মদিনা প্রবেশের দিনটি ছিল ইতিহাসের সর্বাধিক গৌরমবয় একটি দিন। মদিনার আনসাররা নবীজির চলার পথের দু-ধারে দাঁড়িয়ে আর নারীরা ঘর থেকে রাস্তায় নেমে এসেছে। সবার হৃদয়ে আনন্দের হিল্লোল। যুবকরা আনন্দ-ফুর্তিতে সামরিক কলাকৌশল প্রদর্শনে মেতে উঠেছে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা সমবেত কণ্ঠে গেয়ে চলেছেÑ ‘তালায়াল বাদরু আলাইনা…।’ এমন এক আনন্দঘন ও পবিত্র অভ্যর্থনার মধ্য দিয়ে মহানবী (সা.) মদিনায় প্রবেশ করলেন। মহানবীকে বরণ করার জন্য বিভিন্ন গোত্রের লোকেরা এগিয়ে এসে উটনীর রশি ধরে নিজ বাড়িতে আহ্বান জানাচ্ছেন। কিন্তু নবীজি (সা.) উটনীর পথ রোধকারীদের বারবার বললেন, উটনীকে ছেড়ে দাও, সে আল্লাহর তরফ থেকে নির্দেশপ্রাপ্ত। উটনী চলতে চলতে এক সময় আবু আইয়ুব আনসারির বাড়ির সামনে এসে বসে পড়ে। নবীজি (সা.) এখনও উটনী থেকে অবতরণ করেননি; এরই মধ্যে উটনী উঠে সামনের দিকে চলতে থাকে। কিন্তু একটু এদিক ওদিক ঘুরে আবার আগের স্থানে ফিরে এসে বসে পড়ে। রাসুলুল্লাহ (সা.) নেমে পড়েন। আইয়ুব আনসারি (রা.) এগিয়ে গিয়ে রাসুলকে স্বাগত জানালেন এবং উটনী থেকে জিনিসপত্র নামানোর অনুমতি প্রার্থনা করেন। নিজের বাড়িতে মেহমানদারি করার অভিলাষীদের ভিড় তখনও কমেনি। সবারই একান্ত ইচ্ছা রাসুলকে নিজের ঘরে মেহমান হিসেবে বরণ করা। শেষমেশ লোকেরা লটারির ব্যবস্থা করে এবং তাতে আবু আইয়ুব আনসারির নামটি ওঠে।

নবীপ্রেমের অনন্য দৃষ্টান্ত
আবু আইয়ুব আনসারি (রা.) এর বাড়িটি ছিল দোতলা। তিনি নবীজির জন্য ওপরতলা নির্ধারণ করলেন। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজের ও সাক্ষাৎপ্রার্থীদের সুবিধার কথা চিন্তা করে নিচতলাই পছন্দ করলেন। নবীজির পছন্দ অনুযায়ী আবু আইয়ুব আনসারি পরিবার নিয়ে ওপরতলায় অবস্থান নিলেন। রাতের বেলায় ঘুমাতে যাবেন এমন সময় স্ত্রীকে ডেকে বললেন, সর্বনাশ! আমরা কী করলাম! আমরা ওপরে থাকব আর ওহির বাহক আমাদের নিচেÑ এমন একটা তীব্র অনুভূতি তাদের অস্থির করে তুলল। স্বামী-স্ত্রী দুজনই ঘরের কোণে গুটিশুটি মেরে কোনো মতে জেগে রাতটি কাটালেন। সকালে আবু আইয়ুব আনসারি নবীজির কাছে উপস্থিত হয়ে গতরাতের ঘটনা ও তাদের অনুভূতির কথা জানালেন এবং ওপরে চলে যাওয়ার জন্য নবীজিকে অনুরোধ করলেন। রাসুলে কারিম (সা.) তাদের অনুভূতির প্রতি সম্মান জানিয়ে ওপরে চলে গেলেন। (সিরাতে ইবনে হিশাম : ১/৪৮৯)।
রাসুলে করিম (সা.) মসজিদ ও মসজিদ সংলগ্ন তাঁর বাসস্থান তৈরি না হওয়া পর্যন্ত প্রায় ছয় মাস আবু আইয়ুব আনসারির গৃহেই বাস করেন। এ সময় আবু আইয়ুব আনসারি নিজে অথবা আনসাররা পালাক্রমে নবীজির জন্য খাবার পাঠাতেন। খাওয়ার পর যা বেঁচে যেত তা আবু আইয়ুবের কাছে পাঠিয়ে দিতেন। আবু আইয়ুব আনসারি (রা.) খাবারের প্লেটে রাসুলের আঙুলের ছাপ দেখে দেখে সেখান দিয়ে খেতেন। একদিন রাসুল (সা.) খাবার স্পর্শ না করে, সবই ফেরত পাঠিয়ে দিলেন। আবু আইয়ুব আনসারি দ্বিধা ও সংকোচের সঙ্গে রাসুল (সা.) কাছে উপস্থিত হয়ে খাবার গ্রহণ না করার কারণ জানতে চান। তিনি বললেন, খাবারে অত্যধিক রসুন ছিল। আমি রসুন পছন্দ করি না। তবে তোমরা খাও। আবু আইয়ুব আনসারি (রা.) বললেন, ‘আপনার যা পছন্দ নয়, আমিও তা পছন্দ করব না।’ উসদুল গাবাহ : ৩/১৫৮)।

নবীজির দৃষ্টিতে আবু আইয়ুব আনসারি
রাসুলুল্লাহ (সা.) আবু আইয়ুব আনসারিকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। তিনিও প্রিয়তম রাসুলকে প্রাণের চেয়ে বেশি ভালোবাসতেন। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, একদিন দুপুরে আবুবকর সিদ্দিক (রা.) ঘর থেকে বের হয়ে মসজিদের দিকে গেলেন। হজরত ওমর (রা.) তাকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, এই তপ্ত দুপুরে বাইরে? তিনি বললেন, ক্ষুধার যন্ত্রণা ঘর থেকে বের করে এনেছে। ওমর (রা.) বললেন, আল্লাহর কসম! আমারও একই অবস্থা। এরই মধ্যে নবীজি (সা.) ঘর থেকে বের হয়ে তাদের দেখতে পেয়ে বললেন, কী ব্যাপার এ অসময়ে তোমরা এখানে?
তারা বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! ক্ষুধার জ্বালায় আমরা ঘরে থাকতে পারিনি। নবীজি বললেন, ‘যার হাতে আমার প্রাণ সেই সত্তার কসম! আমিও ক্ষুধার যন্ত্রণায় বের হয়ে এসেছি। চলো আমার সঙ্গে। তারা হাঁটতে হাঁটতে আবু আইয়ুব আনসারির বাড়িতে চলে এলেন। আবু আইয়ুব (রা.) এর অভ্যাস ছিল রাসুল (সা.) এর জন্য খাবার প্রস্তুত করে রাখা। তিনি আসতে দেরি করলে অথবা না এলে পরিবারের লোকেরা ভাগ করে খেয়ে নিতেন। দরজায় তাদের সাড়া পেয়ে আবু আইয়ুবের স্ত্রী বের হয়ে বললেন, আল্লাহর রাসুল ও তাঁর সঙ্গিদ্বয়কে আহলান-সাহলান।
রাসুল (সা.) বললেন, আবু আইয়ুব কোথায়? আবু আইয়ুব তখন কাছেই খেজুর বাগানে কাজ করছিলেন। নবীজির আওয়াজ পেয়ে তিনি দ্রুত ছুটে আসেন। অতঃপর বলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! এ সময়ে তো আপনার শুভাগমন হয় না? নবীজি বললেন, তুমি ঠিকই বলেছ। অতঃপর তিনি বাগানে গিয়ে এক কাঁদি শুকনো, কাঁচা ও পাকা-কাঁচা খেজুর কেটে আনলেন। রাসুল বললেন, তুমি এটা কেটে আন তা কিন্তু আমি চাইনি। আবু আইয়ুব বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমি চাই আপনি এই খেজুর থেকে আপনার পছন্দ মতো আহার করুন। আমি এক্ষুণি ছাগল জবাই করছি। রাসুল বললেন, তাহলে দুধের ছাগল জবাই করো না। আবু আইয়ুব আনসারি ছাগল জবাই করে স্ত্রীকে রুটি বানাতে বললেন। আর তিনি লেগে গেছেন ছাগল ভুনা করতে। অতঃপর রুটি ও গোশত মেহমানদের সামনে পেশ করলেন। রাসুল (সা.) এক টুকরো গোশত একটি রুটিতে রেখে বললেন, আবু আইয়ুব! এই টুকরোটি ফাতেমাকে দিয়ে আসো। সে অনেক দিন এমন খাবার দেখে না। খাবার শেষে রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, রুটি, গোশত, শুকনো, পাকা এবং পাকা-কাঁচা খেজুর! তাঁর চোখ সিক্ত হলো। তিনি বললেন, কেয়ামতের দিন এই নেয়ামত সম্পর্কে তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে। অতএব, তোমরা বিসমিল্লাহ বলে খাবার গ্রহণ করবে এবং পরিতৃপ্ত হয়ে এই দোয়া পড়বেÑ আলহামদুলিল্লাহিল্লাজি হোয়া আশবায়ানা ওয়া আনয়ামা আলাইনা ফা আফদালা।’ (মুসনাদে আবি ইয়ালা : ৬১৮১)।

জিহাদে অংশগ্রহণ
আবু আইয়ুব আনসারি (রা.) বদর, উহুদ, খন্দকসহ সব যুদ্ধেই রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সঙ্গে অংশগ্রহণ করেছেন। রাসুলের ওফাতের পর খলিফাদের আমলে যত জিহাদ সংঘটিত হয়েছে তাতেও তিনি পিছিয়ে থাকেননি। জিহাদ করে ইসলামের মর্যাদা সমুন্নত রাখাÑ তিনি জীবনের পরম প্রাপ্তি মনে করতেন। তাই সারাটি জীবন কাটিয়েছেন আল্লাহর পথে জিহাদের ময়দানে। জিহাদের উদ্দেশ্যে তিনি এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপÑ তিনটি মহাদেশেই গমন করেছেন। ৫২ হিজরিতে প্রায় ৮০ বছর বয়েসে রোমানদের বিরুদ্ধে কনস্ট্যান্টিনোপল যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এবং এ যুদ্ধেই তিনি মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেন। ইস্তানবুলের সন্নিকটে তাকে দাফন করা হয়। এই মহান সাহাবির চরিত্রে তিনটি বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে বিদ্যমান ছিল। ১. রাসুলুল্লাহ (সা.) এর প্রতি গভীর ভালোবাসা। ২. ঈমানি জজবা ও উদ্দীপনা। ৩. সত্য ভাষণ।

Leave a Reply

৯৭/৩/খ, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬
মোবাইলঃ ০১৭১২-৬৪৩৬৭৩, বার্তা বিভাগঃ ০১৭১২-৬৪৪৩৫০, সার্কুলেশন বিভাগঃ০১৯১৬০৯৯০২০
ইমেইলঃ [email protected], [email protected]

সম্পাদক:
মোঃ সুলতান চিশতী

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ
মহসিন হাসান খান (বুলবুল)

নির্বাহী সম্পাদকঃ
মোঃ ইব্রাহিম হোসেন

সহকারী সম্পাদকঃ
মোঃ আতোয়ার হোসেন

আইন উপদেষ্টাঃ
শাহিন সরকার


.: Developed By :.
Great IT