২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ১০ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, শরৎকাল

নবীজীবনে আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিভঙ্গি

প্রকাশিতঃ জানুয়ারি ৪, ২০১৮, ১০:২০ পূর্বাহ্ণ


নবীজীবনে আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিভঙ্গি
আন্তর্জাতিক আইন সম্পর্কে আপনারা সম্ভবত অবগত আছেন যে, যুদ্ধ, সন্ধি এবং নিরপেক্ষতাÑ যুদ্ধকালে এ তিনটি বস্তু অতীব প্রয়োজনীয়। রাসুল (সা.) এর জীবনীতে রাজনৈতিক এবং আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে বেশুমার অনুকরণীয় উদাহরণ আমরা পেয়ে থাকি। বিস্তারিত তুলে ধরেছেনÑ ড. মুহাম্মাদ হামিদুল্লাহ
নিরাপত্তা বাড়ানো নবীর কৃতিত্ব
হজরত আদম (আ.) ও হাওয়ার সন্তানদের সময় থেকেই যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছিল। তারা নিজেদের পরস্পরের মধ্যে মারামারি করত। এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু রক্তপাত কমানো, যুদ্ধের পরিবর্তে সন্ধি এবং নিরাপত্তা বাড়ানোর কর্মপদ্ধতি একমাত্র আমাদের প্রিয় নবী (সা.) এর বৈশিষ্ট্য ও অবদান। অবাক হওয়ার মতো বিষয় হলো, মক্কায় প্রথমে কোনো ইসলামী হুকুমত ছিল না। হিজরতের পর নবীজি (সা.) মদিনায় বসবাস করতে শুরু করলেন। ১০ বছর পর তিনি মদিনায় ওফাত লাভ করেন। এখানকার রাজত্ব আরম্ভ হয় মদিনা শহরের এক অংশ থেকে। ১০ বছর পর যখন নবীজির ইন্তেকাল হয়, ওই সময় এ শহরই এমন এক রাজত্বের কেন্দ্রভূমিতে পরিণত হয়েছিল, যা চতুর্দিকে ৩০ লাখ বর্গকিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ নবীজির ইন্তেকালের পর এই ইসলামী রাজত্বের আয়তন ছিল কমবেশি ৩ মিলিয়ন কিলোমিটার। ভিন্ন কথায় ১০ বছর সময়ের মধ্যে চতুর্দিকে ৩০ লাখ বর্গকিলোমিটার আয়তন বিজিত হয়েছিল। যেন দৈনিক গড়পড়তা ৮০০ কিলোমিটার পরিমাণ জায়গা নিয়মিত ইসলামী রাজত্বে বেড়ে চলছিল। এখানে বিজয়ের পরিব্যাপ্তি ও ক্ষিপ্রতার একটা প্রসঙ্গ আছে।


প্রশ্ন হতে পারে, এই ৩০ লাখ বর্গকিলোমিটার বিজয় করতে কত মানুষের রক্ত দিতে হয়েছিল? নবীজি (সা.)ও কি দুনিয়ার অপরাপর বিজয়ী নেতাদের মতো যে, তাঁর কাছে মানুষের রক্তের কোনো মূল্য থাকবে না? এখানেই প্রিয় নবীর অতুলনীয় বৈশিষ্ট্য ও কৃতিত্ব রয়েছে। সিরাতুন্নবীবিষয়ক গ্রন্থাদি থেকে আমি সবগুলো যুদ্ধ; চাই নবীজি সশরীরে শরিক হোন বা না হোনÑ সব যুদ্ধের পরিসংখ্যান একত্রিত করেছি। মুসলমান কতজন ছিলেন? শত্রুপক্ষে কত লোক ছিল? সে যুদ্ধে ক’জন মুসলমান শহিদ হয়েছিলেন? শত্রুপক্ষের ক’জন নিহত হয়েছিল? সাড়ে ১০ বছরের সেই ২৫-৩০টি যুদ্ধের টোটাল পরিসংখ্যান শুনে আপনারা অবাক হয়ে যাবেন। ১০ বছরের মাঝে আছে ১২০ মাস। প্রতি বছরে আছে ১২ মাস। ওই পুরো ৩০ লাখ বর্গকিলোমিটার বিজয় করতে গিয়ে মাসপ্রতি শত্রুপক্ষের দুইজন করেও মরতে হয়নি। এটাই হলো মানুষের রক্তের সেই মূল্য ও মর্যাদা প্রদান, যা রাসুল (সা.) বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করে দেখিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি এমন করেননি যে, থিওরি হিসেবে বলে দিলেন, মানুষের রক্তের অবমূল্যায়ন করো না আর নিজে ক্ষমতা পেয়ে যাচ্ছেতাই করে ফেললেন! যেভাবে আজকাল আমরা দেখতে পাচ্ছি, এমনটা কখনও ছিল না। পুরো সময় শত্রুপক্ষের নিহতের সংখ্যা ২০০ জনও অতিক্রম করেনি। অথচ মাত্র ১০ বছর সময়ে ৩০ লাখ বর্গকিলোমিটার তিনি জয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

উভয়পক্ষের সৈন্যসংখ্যাও বিস্ময়
এবার অন্য একটি বিষয়ের প্রতি খেয়াল করুন। যেসব যুদ্ধে মুসলমান এবং অমুসলমান মুখোমুখি হয়েছিলেন, সেসব যুদ্ধে উভয় দলের সৈন্যদের সংখ্যাও অবাক করার মতো। বদর যুদ্ধে মুসলমানের সংখ্যা মাত্র ৩১২ আর শত্রুদলে সৈন্য সংখ্যা ৯৫০, অর্থাৎ মুসলমানদের চেয়ে তিনগুণেরও বেশি। ওহুদ যুদ্ধে মুসলমান ছিলেন ৭০০ জন আর প্রতিপক্ষে ছিল ৩ হাজার। খন্দক যুদ্ধে মুসলমান ছিলেন ১ হাজার ৫০০ আর অপরপক্ষে ছিল ১২ হাজার। খায়বার যুদ্ধে মুসলমান ছিলেন ১ হাজার ৫০০ আর শত্রুপক্ষে ছিল অস্ত্রসজ্জিত প্রশিক্ষিত ২০ হাজার ইহুদি সৈন্য। আর খায়বারের পুরো জনসংখ্যা কত ছিল, আল্লাহই ভালো জানেন! কেননা, মুসলমানরা তাদের বসবাসের ভূমি খায়বারে গিয়েই যুদ্ধ করেছিলেন। তারা তাদের দুর্গে নিরাপদ অবস্থানে থেকে মুসলমানদের ওপর আক্রমণ করছিল।
এবার চিন্তা করুন, এসব লড়াইয়ে মুসলমানদের জয় হয় শত্রুপক্ষের সৈনসংখ্যা দ্বিগুণ, তিনগুণ, চারগুণ এবং দশগুণ হওয়া সত্ত্বেও। ভাবুন তো, মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্ব কে দিচ্ছিলেন? যুদ্ধের পূর্ব অভিজ্ঞতা যাঁর নেই, সেনাপতি ছিলেন রাসুল (সা.)।

বদরে মহানবীর (সা.) যুদ্ধকৌশল
বদর যুদ্ধের সময় ময়দানের পাশেই একটি ছোট্ট পাহাড়ের চূড়ায় নবীজি (সা.) এর জন্য একটি ছোট্ট ঝোপ নির্মাণ করা হয়েছিল, যাতে ওই ঝোপের ভেতর থেকে নবীজি (সা.) উভয়পক্ষের সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। প্রয়োজন মতো সেখান থেকে নির্দেশনা দিতে পারেন। যেমনÑ মুসলমানদের এই দল যেন আগে বাড়ে, ওই দল যেন পেছনে চলে আসে। অমুক দল যেন ওইদিকে মুজাহিদদের সাহায্য করতে যায় ইত্যাদি। কিতাবাদিতে স্পষ্ট লেখা আছে, ওই জায়গায় ঝোপটির সামনে দুইটি দ্রুতগামী উট প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। সাহাবায়ে কেরাম নবীজি (সা.) এর কাছে অনুরোধ করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আল্লাহ না করুন যদি অবস্থা বেগতিক আকার ধারণ করে তবে আমরা তো আল্লাহর রাহে শহিদ হয়ে যাব। কিন্তু আপনিও যদি শহিদ হয়ে যান তবে ইসলামও খতম হয়ে যাবে। অতএব এমন পরিস্থিতিতে এই উট দুইটি ব্যবহার করে আপনি এবং আপনার ইচ্ছেমতো আরও দু-চারজনকে নিয়ে এ স্থান ত্যাগ করে নিরাপদ দূরত্বে চলে যাবেন। কেউ যদি স্থূলদৃষ্টিতে বিবেচনা করে তবে সে মনে করবে যে, নবীজি (সা.) একজন ভীতু ছিলেন (নাউজুবিল্লাহ)। এবং পলায়নের ব্যবস্থা আগে থেকেই করে রেখেছিলেন। কিন্তু একটু চিন্তা করে দেখুন! তিনি হলেন সবার জন্য উত্তম আদর্শ।
সারা দুনিয়ার আগন্তুক মুসলমান বাদশাহ ও সেনাপতিদের জন্যও তাঁকে আদর্শ হতে হবে। বস্তুত এমন কর্মপন্থা দ্বারা তিনি যেন পরবর্তীদের বলে দিচ্ছেন যে, এমন ব্যবস্থা ও পরিকল্পনা তোমরাও গ্রহণ করবে। এটা তোমাদের রাষ্ট্রের জন্য, রাজত্বের জন্য, যুদ্ধের জন্য এবং স্বয়ং তোমাদের জন্য ফলপ্রসূ।

এ ভাষণে অধুনা জেনারেলরাও হতভম্ব
ভোর থেকে যুদ্ধ শুরু হওয়ার কথা। নবীজি (সা.) রাতেই সৈনিকদের বিন্যস্ত করে দিলেন। এরা সামনে থাকবে, ওরা পেছনে। এরা ডানদিকে থাকবে, ওরা বামদিকে। এ দলের প্রধান হবেন ইনি, অপর দলের প্রধান হবেন উনি। তারপর সকালে সৈনিকদের কাতারবন্দি করেন। সবকিছু নিজে পর্যবেক্ষণ করেন। আজ থেকে ১৪০০ বছর আগের ঘটনা। সৈনিকদের সারিবদ্ধ করে নির্দেশ দিলেন, কেউ যেন অপর থেকে এক ইঞ্চিও সামনে অগ্রসর না হয়। তেমনি এক ইঞ্চিও পেছনে না যায়। হাতে একটি তির।
যদি কোনো ব্যক্তি অনিচ্ছায় হঠাৎ সামনে বা পেছনে চলে যায়, তবে ওই তির দেখিয়ে তাকে যেন স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়, ভাই! একটু আগে বাড়–ন বা একটু পেছনে সরুন। বাহ্যত এটি একটি সাধারণ বিষয় মনে হয়? কিন্তু সৈনিকদের সারিবদ্ধ হওয়ার প্রকৃত রূপ আমরা সেখানেই দেখতে পাই। ফল এই দাঁড়াল যে, সৈনিকদের শক্তি, সাহস ও মনোবল বৃদ্ধিতে কোনো কিছু এত ফলপ্রদ হয়নি, যতটুকু হয়েছিল এ সারিবদ্ধ থাকায়।


তারপর যুদ্ধ শেষ হতেই তিনি সৈনিকদের সম্বোধন করে সংক্ষিপ্ত ভাষণ পেশ করেন। সে ভাষণ শুনে এখনকার জেনারেলরাও হতভম্ব হয়ে যাবেন। নবীজি (সা.) সৈনিকদের নির্দেশ দিলেন, যতক্ষণ শত্রুপক্ষ তোমাদের দিকে এগিয়ে না আসবে ততক্ষণ সোজা দাঁড়িয়ে থাকবে, কেউ যেন সারি থেকে আগে-পিছে না সরে। নিজ সারিতে যেন স্থির থাকে। শত্রু যখন তির পৌঁছবে না এমন দূরত্বে থাকবে, তখন অযথা নিজেদের তির নষ্ট করবে না। যখন দেখবে শত্রু তিরের লক্ষ্যস্থলে আসছে তখন অন্য কোনো অস্ত্র ব্যবহার করবে না, না তরবারি, না বর্শা। শুধু তির ব্যবহার করবে। তির নিক্ষেপের পর প্রত্যেকের সঙ্গেই কিছু পাথর থাকা উচিত; তা ছুড়ে মারবে। পাথর মেরে শত্রুদের আঘাত করতে চেষ্টা করবে। শত্রু যখন আরও কাছে চলে আসবে তখন তোমরা বর্শা হাতে নেবে। এর চেয়েও যদি কাছে চলে আসে তবেই তরবারি দ্বারা শত্রুদের প্রতিহত করবে। অস্ত্রশস্ত্রের সংরক্ষণ, অস্ত্রগুলোকে কার্যকর থেকে কার্যকর বানানো এসব বিষয় আমরা ওই ভাষণ থেকেই শিখতে পাই।
এরপর আরেকটি বিষয় লক্ষ্য করার মতো। মুসলমানদের মধ্যে চেতনা ও প্রেরণা সৃষ্টি করা এবং জান বাজি রেখে যুদ্ধে বিজয় লাভ করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করাÑ এ কাজটিও নবীজি (সা.) অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে করেছেন। সৈনিকদের সম্বোধন করে তিনি বলেন, ‘মুসলমানরা! এ সময় ভূপৃষ্ঠে তোমরা ওই একমাত্র ব্যক্তি, একমাত্র দল, একমাত্র জাতি; যারা আল্লাহর উপাসনা করছ। তোমরা মারা গেলে এ দুনিয়ায় আল্লাহর উপাসনাকারী কেউ অবশিষ্ট থাকবে না। আল্লাহর দ্বীন প্রচারের জন্য তোমরা আমানত বহনকারী।’ অনুমান করতে পারেন যে, প্রত্যেক ব্যক্তির হৃদয় কী পরিমাণ আন্দোলিত হয়েছিল একথায় যে, আমি আল্লাহর আমানত বহনকারী। প্রাণ গেলে যাবে, তবু এ আমানত আমাকে পূর্ণ                   করতেই হবে।

১৯৮৪ সালে সিন্ধু ইউনিভার্সিটিতে ড. মুহাম্মাদ হামিদুল্লাহ (রহ.) প্রদত্ত উর্দু ভাষণের সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর

Leave a Reply

৯৭/৩/খ, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬
মোবাইলঃ ০১৭১২-৬৪৩৬৭৩, বার্তা বিভাগঃ ০১৭১২-৬৪৪৩৫০
ইমেইলঃ [email protected], [email protected]

সম্পাদক:
মোঃ সুলতান চিশতী

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ
মহসিন হাসান খান (বুলবুল)

নির্বাহী সম্পাদকঃ
মোঃ ইব্রাহিম হোসেন

সহকারী সম্পাদকঃ
মোঃ আতোয়ার হোসেন

আইন উপদেষ্টাঃ
শাহিন সরকার


.: Developed By :.
Great IT