২২শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ৭ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, শরৎকাল

নবীজির নাম শুনে প্রতিমারা মাটিতে লুটায়

প্রকাশিতঃ সেপ্টেম্বর ৮, ২০১৮, ১২:৫৬ অপরাহ্ণ


ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী:

মসনবি চতুর্থ খ-ের ৯০৯ থেকে ৯১৪নং বয়েতের প্রতিপাদ্য ছিল মূর্তিপূজারিরা প্রকৃত উপাস্যকে হারিয়ে ফেলে বিধায় ক্ষণস্থায়ী ও ধ্বংসশীল উপাস্যদের পায়ে নিজের পূজা, অর্চনা উৎসর্গ করে। কেননা পূর্জা, অর্চনা, ইবাদত বা পরম শক্তির কাছে নিজেকে উৎসর্গ করার মনোবৃত্তি মানুষের সৃষ্টিগত একটি প্রেরণা। আল্লাহ তায়ালাই মানুষের মধ্যে জন্মগতভাবে এ প্রেরণা সৃষ্টি করে দিয়েছেন। এ প্রেরণার দাবি হচ্ছে, মানুষ তার প্রকৃত উপাস্য প্রভুকে খুঁজে নেবে। কেননা তিনিই অপার দয়া ও অনুগ্রহের কারণে তাকে যারা বিশ্বাস করে বা বিশ্বাস করে না, উভয় শ্রেণির প্রতি দয়ার হাত প্রসারিত রাখেন। তাদের জীবন-জীবিকার নানাবিধ প্রয়োজন পূরণ করেন। মওলানা একটি মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ের অবতারণা করেন যে, মূর্তিপূজারিরা যখন তাদের উপাস্যদের কাছে নিজেকে সঁপে দেয়, ভক্তি ও বিশ্বাসে আত্মহারা হয়ে যায়, তখন তাদের মনে হয় যেন, মূর্তি তাদের সঙ্গে কথা বলছে। তাদের কোনো দিকে ইশারা-ইঙ্গিত করছে। তখন তারা মনে করে, আমি প্রতিমার কাছ থেকে কিছু পেয়ে গেছি। অথচ এ পাওয়াও কুকুরের সামনে হাড় ছুড়ে দেওয়ার মতো একটি ব্যাপার। কেননা আল্লাহ কাউকে মাহরুম করেন না। কোরআনে এরশাদ হয়েছেÑ ‘কেউ দুনিয়াবি সুখ-সম্ভোগ কামনা করলে আমি যাকে ইচ্ছা এখানেই সত্বর দিয়ে থাকি; পরে তার জন্য জাহান্নাম নির্ধারিত করি। সেখানে সে প্রবেশ করবে নিন্দিত ও আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে দূরীকৃত অবস্থায়। আর যে ব্যক্তি মোমিন হয়ে পরকালকে কামনা করে এবং এর জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করে তাদের প্রচেষ্টা পুরস্কারযোগ্য। আপনার প্রতিপালক তার দান দ্বারা এদের (যারা মোমিন অবস্থায় পরকালীন পুরস্কার চায়) এবং ওদের (যারা শুধু দুনিয়াবি সুখ-সম্ভোগ চায়) সাহায্য করেন এবং আপনার প্রতিপালকের দান অবারিত।’ (সূরা বনি ইসরাইল : ১৮-২০)।
উপরি-উক্ত জীবন দর্শনের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে মওলানা সামনে আনেন আমাদের প্রিয়নবীর (সা.) শৈশবে হারিয়ে যাওয়ার একটি ঘটনা। নবীজি জন্মগ্রহণ করেছিলেন তখনকার আরবের সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত কোরাইশ বংশের বনু হাশিম গোত্রে। তখনকার আরবের নিয়ম অনুযায়ী নবজাতককে দুধ পান করানোর জন্য দেওয়া হয় সাদিয়া গোত্রের হালিমা নাম্নী এক মহিলার কাছে। শিশুনবীর দুধ-মা হওয়ার সুবাদে তিনি আমাদের কাছে মা হালিমা (রা.)। জন্মের আগেই শিশুনবী তাঁর বাবা আবদুুল্লাহকে হারিয়েছিলেন। ফলে তার অভিভাবক ছিলেন কোরাইশদের অতি সম্মানিত নেতা দাদা আবদুল মুত্তালিব।
দুধ পানের বয়স যখন শেষ হয়ে যায় মা হালিমা তাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে আসেন মক্কায় দাদা আবদুল মুত্তালিবের কাছে ফেরত দেওয়ার জন্য। প্রথমে শিশু মুহাম্মদকে নিয়ে তিনি যখন কাবাঘর চত্বরে প্রবেশ করেন আকাশ থেকে একটি আওয়াজ শুনতে পান। কিন্তু কিছুই বুঝতে পারেন না এই আওয়াজ কার এবং কোত্থেকে। বারবার চেষ্টা করেন এমন আওয়াজের উৎস সন্ধানের। কিন্তু অনবরত ধ্বনিত হচ্ছে এ আহ্বান। হালিমা বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে যান। এক পর্যায়ে তিনি শিশুকে কোল থেকে নামিয়ে কাবাঘরের দেয়ালের বাইরে হাতিমে রাখেন। তখন স্পষ্টভাবে শুনতে পান, কে যেন বলছেনÑ
আয হাওয়া বেশনীদ বাঙ্গী কান হাতীম
তা’ফত বর তো আ’ফতা’বী বস আযীম
বাতাস থেকে কেউ ডাক দিয়ে যায়, হে হাতিম!
তোমাতে আজ কিরণ ছড়ায় বিশাল সূর্যপ্রতিম।
সূর্যের চেয়ে শত হাজার গুণ দ্যুতি এই নূরের …।
হালিমা এদিক-ওদিক তাকান। কিন্তু না তার সব চেষ্টা ব্যর্থ। হঠাৎ দেখেন, তার পাশে মুহাম্মদ নেই। হালিমা হতবিহ্বল। এদিকে খোঁজেন, ওদিকে দৌড়ান, শিশু মুহাম্মদ কোথাও নেই। শুরু হলো, মক্কার ঘরে ঘরে ধরনা। এ বাড়ি ও বাড়ি খোঁজ করেন। হালিমার বুক ফাটা কান্নায় আকাশ-বাতাসে তখন কান্নারোল ওঠে। সবার এককথা, তোমার শিশু সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না।
রীখত চন্দান আশকহা উ বা ফগান
কে আয উ গেরয়ান শুদান্দ মক্কীয়ান
হালিমার চোখে অশ্রুবন্যা বুক ফাটা কান্না
হালিমার শোকে কাঁদে মক্কার অধিবাসীরা।
এরই মধ্যে এক বৃদ্ধ লোক লাঠি হাতে হালিমার কাছে এসে জানতে চায়, ব্যাপার কী ঘটেছে, অঝোর নয়নে কাঁদছ কেন মা? হালিমা সবকথা খুলে বলে। বৃদ্ধ হালিমাকে অভয় দেয়। তুমি চিন্তা করো না। আমি তোমাকে আমাদের প্রতিমা ওজ্জার কাছে নিয়ে যাব। আমরা কিছু হারালে তার কাছে যাই। তিনি বলে দেন। চলো তার কাছে। তিনি বলে দেবেন তোমার শিশু এখন কোথায় আছে? হালিমার চেহারায় আশার ঝিলিক খেলে গেল। বৃদ্ধ তাকে নিয়ে গেল প্রতিমা ওজ্জার কাছে। বৃদ্ধ প্রতিমার পায়ে সিজদায় লুঠিয়ে বলল, ওহে আমাদের ঈশ্বর, আরব-ঈশ্বর! আমাদের প্রতি তোমার দয়া অনুগ্রহের অন্ত নেই। আমাদের বড় বড় বিপদ থেকে তুমি উদ্ধার করেছ। আমরা তোমার একান্ত ভক্ত, অনুরক্ত। এখন একটি বিপদে পড়ে এসেছি তোমার কাছে।
ইন হালিমা সা’দী আয উমিদে তো
আমদ আন্দর যিল্লে শাখে বেইদে তো
তোমার কাছে হালিমা সাদিয়া বুকভরা আশায়
আশ্রয় নিয়েছে আজ তোমার দয়ার বৃক্ষ ছায়ায়।
তার এক সন্তান হারিয়ে দিশাহারা অস্থির মন
মুহাম্মদ নাম, বলো এই শিশু কোথায় এখন।
কিন্তু যেই না মুহাম্মদ নামটি উচ্চারিত হলো ওজ্জাসহ সেখানকার সব মূর্তি ভূলুণ্ঠিত হলো। বৃদ্ধ তো হতভম্ব। অবস্থাগত ভাষায় মূর্তিরা যেন তাকে বললÑ
কে বরো আই পীর ইন চে জুস্তজোস্ত
আন মুহাম্মদ রা’ কে আযলে মা আযুস্ত
হে বৃদ্ধ কাকে সন্ধান করতে এসেছ এখানে
মুহাম্মদ! আমাদের পতন হবে যার কারণে!
বৃদ্ধ তো ভয়ে বিজড়িত। তার ঠোঁট কাঁপে। পা থরথর করে। হাতের লাঠি পড়ে যায় মাটিতে। হালিমা এ অবস্থা দেখে বৃদ্ধকে বলেন, হে বৃদ্ধ চাচা! আমিও তো হতবাক। ভেবে দিশকূল পাই না। আমি জানি না, বুঝি না। কখনও বাতাস আমার সঙ্গে কথা বলে। কখনও পাথরের জবান খুলে যায়। অদৃশ্য লোকের কেউ এসে আমার সন্তানকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এতকিছু হচ্ছে। আমার সন্তানকে নিয়ে এ প্রান্তরে মক্কার বুকে এত ঘটনা, আমি জানি না। আমি একটি কথাই বলতে পারি। আমার সন্তান এখানে হারানো গেছে। আমি এর বেশি কিছু বলব না। বললে, লোকরা আমাকে পাগল বলবে।
বৃদ্ধ প্রকৃতিস্থ হয়ে হালিমাকে সান্ত¡না দেয়। মা ধৈর্য ধরো। এ জীবনে বিস্ময়কর অনেক কিছুই দেখবে। আমার তো পরিণত বয়স। এই জীবনে আমার সামনে এমন ঘটনা একবারও ঘটেনি যে, কারও নাম শুনে আমাদের বিচক্ষণ দেবতারা সবাই ধূলায় লুণ্ঠিত হয়েছে।
এত বড় ঘটনার খবর চাপা থাকে না। সমগ্র মক্কায় ছড়িয়ে পড়ল শিশু মুহাম্মদ হারিয়ে যাওয়ার সংবাদ। খবর চাউর হয়ে পৌঁছে যায় আবদুল মুত্তালিবের বাসভবনে। দাদা আবদুল মুত্তালিব হায় হায় চিৎকার দিয়ে ছুটে যান কাবাঘর অভিমুখে। মক্কার সর্দারের এমন অবস্থা দেখে চারদিকে সাজসাজ রব। আবদুল মুত্তালিব কাবাঘরে এসে নালিশ জানালেন সরাসরি আল্লাহর কাছে। কান্নায় আহাজারিতে অশ্রুতে তার বুক ভেসে যায়। প্রভু হে! আমি যে তোমার কাছে কোনো ফরিয়াদ জানাব সে সাহস আমার নেই। আমি তো অতি তুচ্ছ, নগণ্য। আমি জানি, আমার শিশুর প্রতি তোমার খাস দয়া আছে। সেই শিশু মুহাম্মদের নামের উসিলায় তোমার কাছে ফরিয়াদ জানাই, দয়া করে আমায় জানিয়ে দাও সে এখন কোথায়।
মন হাম উ রা মী শফী’ আ’রম বে তো
হালে উ আই হাল দান বা মন বগো
আমিও তাকে সুপারিশকারী বানাই তোমার কাছে
জানাও প্রভু! তুমি তো জান সে এখন কোথায় আছে।
আবদুল মুত্তালিব কান্নার মধ্যে আত্মমগ্ন ছিলেন, এমন অবস্থায় কাবাঘরের ভেতর থেকে মনে হলো কেউ বলছে। সবর কর। সে এখন অমুক প্রান্তরে অমুক গাছের ছায়ার নিচে খেলছে। আবদুল মুত্তালিব রওনা দিলেন সেই প্রান্তর পানে। তার পেছনে ছুটল মক্কার গণ্যমান্য লোকরা। গিয়ে দেখেন শিশু মুহাম্মদ ঠিকই সেই গাছের নিচে খেলছে। কোলে তুলে বুকে জড়িয়ে নিয়ে এলেন কোরাইশ বংশের শ্রেষ্ঠ সন্তান মুহাম্মদকে। তখন কি তাদের জানা ছিল মা আমেনার নয়নের মণি এই সন্তান হবে একদিন দুনিয়াবাসীর জন্য আল্লাহর খাস রহমত, তার নুরের জ্যোতিতে উদ্ভাসিত হবে সমগ্র জগৎ। মওলানা রুমি (রহ.) আবদুল মুত্তালিবকে উদ্দেশ করে বলেনÑ
তিফলে তো গরছে বে কুদাক খো বুদাস্ত
হার দো আলম খোদ তোফায়লে উ বুদাস্ত
তোমার শিশুর যদিও স্বভাব শিশুসুলভ
তার উসিলায় অস্তিত্ব পেল উভয় জগৎ।
তোমার কোলের শিশু মুহাম্মদকে গাছের নিচে খেলতে দেখে মনে করেছ শিশুদের মতো খেলছে সে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে দুনিয়া ও আখেরাত এই দুটি জগৎ তার তোফায়ল ও উসিলায় আল্লাহপাক অস্তিত্ব দান করেছেন। বলেছেনÑ হে নবী আপনাকে সৃষ্টি করা আমার উদ্দেশ্য না থাকলে আমি আসমান-জমিন, দুনিয়া-আখেরাত কিছুই সৃষ্টি করতাম না।
(মওলানা রুমির মসনবি শরিফ
৪খ. বয়েত, ৯১৫-১০৪০)।

Leave a Reply

৯৭/৩/খ, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬
মোবাইলঃ ০১৭১২-৬৪৩৬৭৩, বার্তা বিভাগঃ ০১৭১২-৬৪৪৩৫০
ইমেইলঃ [email protected], [email protected]

সম্পাদক:
মোঃ সুলতান চিশতী

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ
মহসিন হাসান খান (বুলবুল)

নির্বাহী সম্পাদকঃ
মোঃ ইব্রাহিম হোসেন

সহকারী সম্পাদকঃ
মোঃ আতোয়ার হোসেন

আইন উপদেষ্টাঃ
শাহিন সরকার


.: Developed By :.
Great IT