২১শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ৬ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, শরৎকাল

নওয়াল সুফি : নন্দিত মানবাধিকার কর্মী

প্রকাশিতঃ সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৮, ১০:১৬ পূর্বাহ্ণ


অকূল সমুদ্রে দিকহারা মানুষের সন্ধানী চোখ যে আশা নিয়ে একটি লাইটহাউস বা বাতিঘর খোঁজ করে, বিশ^ব্যাপী উদ্বাস্তু মানুষের কাছে সেই বাতিঘরের নাম এখনÑ নওয়াল। ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সমুদ্রে সর্বহারা মানুষের যখন আর উপায় থাকে না, তখন নওয়ালের ফোন নম্বর তাদের সামনে দেদীপ্যমান আলো হয়ে আবির্ভূত হয়। এভাবে মাত্র ৩০ বছর বয়সী একটি নারী হয়ে ওঠেন সব বয়সী সর্বহারার জননী। তারা আদর করে সমীহ নিয়ে তাকে ডাকেন, ‘মামা নওয়াল’Ñ নওয়াল, আমাদের মা জননী। নওয়ালও তাদের সঙ্গে উষ্ণ ও গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলেন। প্রতি মুহূর্তে তাদের কাছে অনুগ্রহের সবটুকু পৌঁছে দিতে চেষ্টা করেন হৃদয় উজাড় করে।
তার পুরো নামÑ নওয়াল আল-সুফি। ১৯৮৮ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন উত্তর আফ্রিকার দেশ মরক্কোতে। বয়স যখন মাত্র ৩ সপ্তাহ তখন পরিবারের সঙ্গে ইতালির সিসিলিতে অভিবাসী হয়ে আসেন। বেড়ে ওঠেন এটনা পাহাড়ের পাদদেশে কাতানিয়া শহরে। সিসিলি বিশ^বিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে হায়ার ডিপ্লোমা ডিগ্রি অর্জন করেন। মাত্র ১৪ বছর বয়সে মরোক্কান অভিবাসী ও গৃহহারা মানুষকে আইনি সহায়তা দেওয়ার মধ্য দিয়ে তার স্বেচ্ছাসেবক জীবনের সূচনা হয়। বিশ^বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বছরেই নিজের সামান্য শিক্ষাগত যোগ্যতা পুঁজি করে ইতালির ভবঘুরে মানুষের অধিকার প্রশ্নে লড়াই শুরু করেন। বিশেষ করে মরোক্কান অভিবাসীদের জীবিকা অর্জন ও শিক্ষাদানের বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপন করেন রাষ্ট্রের সম্মুখে। আরবি ও ফরাসি উভয় ভাষায় অভিজ্ঞতার সূত্রে এক পর্যায়ে ইতালির সিসিলিয়ান কোর্টে ও কারাগারে খ-কালীন অনুবাদক হিসেবেও কাজের সুযোগ পান।
তিনি একই সঙ্গে একজন মানবাধিকারকর্মী, অবৈধ অভিবাসীদের প্রাথমিক আইনি সহায়তা প্রদানকারী এবং ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামীদের পক্ষে সংগ্রামকারী নারী। ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার জন্য আওয়াজ তুলতে গিয়েই জড়িয়ে পড়েন আরব বসন্তের সময়কার বিভিন্ন আন্দোলনে।
২০১২ সালে যখন তার বয়স মাত্র ২৪, সিরিয়ার যুদ্ধে বিধ্বস্ত আলেপ্পো তাকে প্রবলভাবে টানতে থাকে। তিনি একটি যুগান্তকারী ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে বসেন, যা তার পরবর্তী জীবনকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়। এ-বছর ডিসেম্বরে চিকিৎসা সামগ্রী বহন করা একটি অ্যাম্বুলেন্সের পিছু পিছু তুর্কি সীমান্ত দিয়ে সিরিয়ায় ঢুকে পড়েন এবং আলোপ্পার একটি হাসপাতালে যান। সেখানে দীর্ঘ আড়াই মাস ধরে ভ্রাম্যমাণ স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেন। ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় আহতদের জন্য চিকিৎসা সামগ্রী, ওষুধ, রক্ত ইত্যাদি সংগ্রহ করে নিজের ছোট্ট কক্ষে সেবাদানের কাজ চালান। সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে বন্ধুদের কানেক্ট করে এক্টিভিটিকে আরও ত্বরান্বিত করেন। ২০১৩ সালের মার্চে সিরিয়ার ৮০০ উদ্বাস্তু পরিবারকে ‘ফ্রিডম কনভয় ফর হোমস’ নামে একটি মানবাধিকার সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে তাদের ইউরোপের উদ্বাস্তু শিবিরে নিয়ে আসতে সহযোগিতা করেন। এ সময় তিনি লক্ষ করেন, উদ্বাস্তু মানুষ কীভাবে সাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে ঢোকার প্রাণন্তকর চেষ্টা করছে এবং বেঘোরে প্রাণ হারাচ্ছে। তিনি সেখানে তার ফোন নম্বর সংযুক্ত কার্ড সবাইকে বিতরণ করেন।
ইতালির বন্দর নগর কাতানিয়া ফিরে আসতেই নওয়াল প্রথম কলটি পান। সেই গ্রীষ্মে ভয়ার্ত একজন অভিবাসী ফোন করে তাকে জানায়, ‘আমরা ৪০০ যাত্রী লিবিয়া থেকে আসছি। স্মাগলাররা আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। প্লাস্টিকের বোটে ডুবতে ডুবতে কোনোমতে ভেসে আছি আমরা। বোট ক্রমেই সমুদ্রের গভীর থেকে গভীরে চলে যাচ্ছে। প্লিজ কোস্টগার্ডদের খবর দিন। আমাদের রক্ষা করুন।’ নওয়াল যেহেতু ইতালিয়ান ও আরবি উভয় ভাষায় পারদর্শী, তাই তৎক্ষণাৎ তাদের কথা বুঝে কোস্টগার্ডকে খবর দিতে সক্ষম হন। তারা দুর্গতদের ফোনের জিপিএস সিস্টেম ব্যবহার করে সঠিক অবস্থান চিহ্নিত করেন এবং উদ্ধার করে ক্যাম্পে পৌঁছে দেন। এই ঘটনা তাকে বিশ^ব্যাপী পরিচিত করিয়ে দেয়। শুরু হয় নওয়ালের নতুন জীবন।
নওয়াল নিজেকে উৎসর্গ করেন ভূমধ্যসাগরে ডুবোপ্রায় প্লাস্টিক নৌকায় চড়ে পালিয়ে আসা অসংখ্য সিরীয় রিফিউজির জীবন বাঁচাতে। যাদের বেশিরভাগ শিশু, কিশোর ও নারীÑ যাদের দুর্বিষহ ললাটে আঁকা থাকে একফোঁটা ভূমির আকুতি। নওয়াল ছুটতে থাকেন স্টেশনের পর স্টেশন এবং যারাই কোনোমতে কূলে উঠতে পারে নওয়াল তাদের নিজের ফোন নম্বর দেন, তাদের নম্বর এবং যারা এখনও সমুদ্রে ভাসমান তাদের নম্বরও সংগ্রহ করেন। তারপর নম্বরগুলো তুলে দেন ইতালিয়ান কোস্টগার্ডের হাতে। সঙ্গত কারণেই এর পর থেকে তার ফোনে কল আসে একের পর একÑ সর্বহারা মানুষ বাঁচার অসীম তৃষ্ণা নিয়ে তাকিয়ে থাকে বাতিঘরের দিকে, একটি নারীকণ্ঠের সিগন্যালের প্রত্যাশায়।
এসব করতে গিয়ে নওয়ালকে বহু কঠিন বাধার মুখেও পড়তে হয়। আলগোছে জঙ্গিদের বহর ঢুকে পড়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। সরকারের তরফ থেকে গ্রেপ্তারির ভয় তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। অবৈধ অভিবাসীদের সাহায্য করার অভিযোগে আদালতে অভিযুক্ত হতে হয়। কিন্তু মানবতার সাহায্যে এগিয়ে আসার প্রচ- আবেগ ও হৃদ্যতা সব বাধা উৎরে তাকে এগিয়ে দেয় আরও সামনে। এমনকি ২০১৬ সালে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টেও তাকে ডেকে পাঠানো হয় নিজের কাজের পক্ষে সাফাই বক্তব্য পেশ করতে। নওয়াল সেখানে বলেনÑ আমাদের এখনই ইউরোপ সীমান্তে একটি মানবিক করিডোর দরকার, যেন ঘরহারা মানুষকে ইউরোপের দুয়ারে এসে ফিরে যেতে না হয়। শেইলা ম্যাকভিকারকে দেওয়া আলজাজিরার একটি সাক্ষাৎকারে নওয়াল তার দুঃসহ স্মৃতির কথা বলেনÑ একবার উদ্বাস্তুদের ১৭টি বোট সাগরের মধ্য থেকে একসঙ্গে সাহায্যের জন্য আবেদন করে। কিন্তু তিনি মাত্র ৮টি বোটের কল পিক করতে সমর্থ হন এবং শেষ পর্যন্ত সেই ৮টি বোটই উদ্ধার করা গেছে, বাকিদের সলিল সমাধি হয়েছে।
গণমাধ্যমে তিনি কখনও ‘দ্য অ্যাঞ্জেল অব রিফিউজি’ কিংবা ‘দ্য রিফিউজি হেল্পার’, আবার কখনও ‘লেডি এসওএস’ নামে উঠে আসেন। সংবাদ ভাষ্য মতে, অন্তত এ পর্যন্ত ২ লাখ মানুষের জীবন বাঁচিয়েছেন তিনি, যারা তার সহযোগিতায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে অভিবাসী হতে পেরেছে। তিনি বলেন, ‘ফোন এখন আমার জীবনের অংশ হয়ে গেছে। আমি কখনও আমার ফোন বন্ধ করি না; যেন নিমজ্জমান অসহায় মানুষ তাদের অবস্থান জানাতে গিয়ে আশাহত না হয়। যেন কোস্টগার্ড সদস্যরা তাদের সমুদ্র থেকে তুলে আনতে পারে। যখন পৃথিবীর সব মানুষ নিরাপদ হবে, সেদিনই আমি আমার ফোন বন্ধ করতে পারব।’ ফলে অস্থির আরব বিশে^ এরই মধ্যে নওয়াল ‘আশার প্রদীপ’ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছেন।
নওয়াল তার কাজের জন্য কোনো বিনিময় গ্রহণ করেন না। তবে কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বেশ কয়েকটি সম্মাননা লাভ করেছেন। সিরিয়া ও লিবিয়ার উদ্বাস্তুদের ওপর নির্মিত তার একটি ডকুমেন্টারি ইতালির মার্জামেমি শহরে অনুষ্ঠিত ‘ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল’ কর্তৃক ‘ডোনা ডি ফ্রন্টিয়েরা’ (বর্ডার ওম্যান) অ্যাওয়ার্ড জিতে নিয়েছে। ২০১৫ সালে ইতালিয়ান সাংবাদিক ডেনিয়েল বেইলা তার কর্মতৎপরতার ওপর ভিত্তি করে একটি গ্রন্থও রচনা করেনÑ ‘নওয়াল : দ্য অ্যাঞ্জেল অব রিফিউজি’। ২০১৭ সালের ২৮ মে তিনি আরব আমিরাতের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী শায়খ মুহাম্মাদ বিন রশিদ আল-মাকতুম কর্তৃক ‘আরব হোপ মেকার’ হিসেবে মনোনীত হয়েছেন। সম্মাননা গ্রহণ করতে গিয়ে নওয়াল বলেন, অকূল সমুদ্র থেকে যখন কেউ আমার ফোনে কল করে, আমি অনুভব করি, সে আমার আত্মার অংশ। যেন আমি নিজেই ডুবে যাচ্ছি এবং বাঁচার আশায় হাত-পা ছুড়ছি। ভাবি, আমি নওয়াল নইÑ আমি জেসমিন, বারা, মুস্তফা, মুহাম্মাদ। যখন কোস্টগার্ড কাউকে উদ্ধার করে আনে, আমি একজন মায়ের মতো প্রথম সন্তান জন্মদানের সুখ অনুভব করি। এ বছরের জানুয়ারিতে জর্ডানের রয়েল ইসলামিক স্ট্রাটেজিক স্টাডিজ সেন্টার থেকে প্রকাশিত ‘দ্য মুসলিম ৫০০’ সংখ্যায় প্রথমবারের মতো তাকে ‘পারসন অব দ্য ইয়ার’ ঘোষণা করা হয়।
ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে, ‘ইন দ্য ওম্ব অব সাফারিং হোপ ইজ বর্ন’Ñ কষ্টের গর্ভেই আশার জন্ম হয়। আমরা সর্বহারা উদ্বাস্তু মানুষের ‘আশা’ নওয়াল আল-সুফির দীর্ঘায়ু কামনা করি; যেন তার আত্মার বীজ হয়ে আরও অসংখ্য আশার জন্ম হয় দুর্ভোগের পৃথিবীতে।

Leave a Reply

৯৭/৩/খ, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬
মোবাইলঃ ০১৭১২-৬৪৩৬৭৩, বার্তা বিভাগঃ ০১৭১২-৬৪৪৩৫০
ইমেইলঃ [email protected], [email protected]

সম্পাদক:
মোঃ সুলতান চিশতী

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ
মহসিন হাসান খান (বুলবুল)

নির্বাহী সম্পাদকঃ
মোঃ ইব্রাহিম হোসেন

সহকারী সম্পাদকঃ
মোঃ আতোয়ার হোসেন

আইন উপদেষ্টাঃ
শাহিন সরকার


.: Developed By :.
Great IT