১৮ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, হেমন্তকাল

দালালি পেশা : শরয়ি বিশ্লেষণ

প্রকাশিতঃ অক্টোবর ১৫, ২০১৮, ১২:০৮ পূর্বাহ্ণ


দালালের উপরোক্ত উভয় ধরনের পারিশ্রমিক হালাল। এমনকি পারিশ্রমিকের পরিমাণ নির্দিষ্ট করে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ থাকলে একটি মাল বেচাকেনা করে দিয়ে উভয় পক্ষ থেকে দালালি মূল্য গ্রহণ করাও হালাল হবে

পারিশ্রমিকের বিনিময়ে অপরের মাল ক্রয়-বিক্রয়ের মধ্যস্থতার ভূমিকা পালনকারীকে আমাদের সমাজে দালাল বলে অভিহিত করা হয়। দালালিকে আরবিতে ‘সামসারা’, আর দালালকে ‘সিমসার’ বলা হয়। যিনি দালালি করেন, তিনি কখনও বিক্রেতার পক্ষে, কখনও ক্রেতার পক্ষে আবার কখনও ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের পক্ষে দালালি করে থাকেন। (আলমাউসুআতুল ফিকহিয়্যাহ : ১০/১৫১)। ব্যবসাবাণিজ্যের বিস্তৃতির এ আধুনিককালে দালালি পেশা একটি সম্মানজনক পেশায় পরিণত হয়েছে। যদিও প্রাচীনকাল থেকেই দালালি পেশাকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হতো; তবু দালালরা বর্তমানের ব্যবসাবাণিজ্যের অপরিহার্য অংশ। দালালভিত্তিক নানা সোসাইটিও গড়ে উঠেছে আমাদের সমাজে। বর্তমানে ঢাকা হলো মাল্টিপারপাস সোসাইটির শহর। শুধু রাজধানী কেন, বিভাগীয় এবং মফস্বল শহরগুলোতেও এখন এসব সোসাইটির ব্যাপক ছড়াছড়ি। এসব প্রতিষ্ঠানের অর্থ জোগানের কাজ আঞ্জাম দিয়ে থাকেন দালালরা। ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কমিশনের বিনিময়ে এসব দালাল সাধারণ মানুষের জমানো টাকাপয়সা সংগ্রহ করে সোসাইটিকে এনে দেন। শুধু এ কালেই নয়, প্রাচীনকাল থেকেই হাট-বাজারে ছিল তাদের সরব উপস্থিতি। (মাবসূত লিসসারাখসী : ১৫/১১৫; আওনুল মাবুদ : ৯/১২৪)।
বর্তমানে অসাধু ব্যবসায়ী ও ব্যবসায়িক অঙ্গনে অসততার আধিক্যের কারণে কোনো জিনিস ক্রয় করতে বা বিক্রি করতে সঠিক দাম পাওয়ার ব্যাপারে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগতে হয়। বাধ্য হয়ে মানুষ এমন দালালদের খোঁজে, যারা মূল্য সম্পর্কে পরিপক্ব ধারণা রাখে। আবার অনেক সময় স্বল্পতা, নিরাপত্তার অভাব ও অনুপস্থিতির অজুহাতেও দালাল ধরার প্রয়োজন দেখা দেয়। তবে দালাল ধরতে সুবিধার পাশাপাশি অসুবিধাও রয়েছে। কারণ অন্যান্য পেশার মতো এ পেশাতেও অনুপ্রবেশ ঘটেছে প্রতারক, মিথ্যাচারী ও দুশ্চরিত্রের। তাই অনেক সময় তা হিতে বিপরীত হয়। অবশ্য স্বভাব ধর্ম ইসলাম মানুষের স্বাভাবিক এ প্রয়োজনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। কারণ দালাল তার মেধা, শ্রম ও সময় ব্যয় করে অন্যের পণ্য খরিদ করে বা বিক্রি করে দেয়। ইসলামের দৃষ্টিতে দালাল হলোÑ আজিরে মুশতারিক বা সময়মুক্ত শ্রমিক। অতএব অন্যান্য শ্রমিকের মতোই দালালি করে মজুরি নেওয়া জায়েজ। তবে শর্ত হলোÑ কত টাকা মজুরি দিতে হবে, তা আগেই নির্দিষ্ট করে নিতে হবে। (ফাতাওয়া শামী : ৫/৩৩; আহসানুল ফাতাওয়া : ৭/২৭২; ফাতহুল বারী : ৪/৪৫২; আলমুদাওয়ানা : ৩/৪৬৬; আলমুগনী : ৮/৪২; ফাতাওয়াল লাজনাতিত দায়িমা : ১৩/১২৫; ফাতওয়া শায়খ ইবনে বাজ : ১৯/৩৫৮)।
দালালির কয়েকটি সুরত
দালালির বিভিন্ন সুরত হতে পারে। একটি সুরত হতে পারে এ রকমÑ কোনো ব্যক্তি এভাবে চুক্তি করল যে, আমার গাড়ি বা বাড়ি বিক্রি করা দরকার। তুমি আমাকে এক মাসের ভেতর ক্রেতা খুঁজে দাও। আমি তোমাকে এক মাসের বেতন প্রদান করব। এখন লোকটি যদি পনেরো দিনেই ক্রেতা খুঁজে দিতে পারে, তাহলে সে পনেরো দিনের পারিশ্রমিকই পাবে। আবার পুরো মাস চেষ্টা করেও যদি ক্রেতা মেলাতে না পারে; তবু সে পুরো মাসের বেতন পেয়ে যাবে। এটা দালালি নয়, মাসিক বেতন। এটা জায়েজ হওয়ার ব্যাপারে কারোই দ্বিমত নেই। (মাবসূত লিসসারাখসী : ১৫/১১৫, আওনুল মাবুদ : ৯/১২৪)।
তবে দালালির সবচেয়ে প্রসিদ্ধ সুরত হলো এভাবে চুক্তি করা যে, তুমি আমার গাড়ি বা বাড়িটি বিক্রি করে দাও। বিক্রি করে দিতে পারলে ৫ হাজার টাকা প্রদান করব। এতে সাধারণত সময় ধার্য করা থাকে না; বরং লেনদেন সমাপ্তি শেষে তাকে চুক্তিকৃত টাকা প্রদান করা হয়। চাই সে দুই দিনের ভেতরই করুক বা দুই মাস লেগে যাক বা তার চেয়ে বেশি। যখন সে কাজ সমাধা করে দিতে পারবে, তখনই টাকা পাবে। এমনকি সে যদি অনেক পরিশ্রম করার পরও পণ্যটি বিক্রি করে দিতে না পারে, তাহলে সে চুক্তিকৃত টাকা থেকেও বঞ্চিত হবে। এটাকে ‘জাআলা’ (কাজ শেষে মজুরি) বলে। (রদ্দুল মুহতার : ৬/৬৩)। দালালির এ সুরতটি জায়েজ হওয়ার ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। ইমাম মালেক (রহ.), ইমাম শাফেয়ি (রহ.) ও ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.) পারিশ্রমিক নির্দিষ্ট থাকলে দালালিকে নিঃশর্তভাবে জায়েজ বলেন। (ফাতহুল বারী : ৪/৪৫২)। আর ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর পক্ষ থেকে এ ধরনের চুক্তি (জাআলা) জায়েজ-নাজায়েজের ব্যাপারে কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না। তাই পরবর্তী সময়ে হানাফি আলেমরা যাদের মধ্যে রয়েছেন আল্লামা শামী (রহ.) এটাকে জায়েজ সাব্যস্ত করেছেন। (ইলাউস সুনান : ১৩/৪০; বাদায়িউস সানায়ে : ৬/৮; আলমুগনী : ৬/৩৫০)। তারা কোরআনুল কারিমের সূরা ইউসুফের ৭২নং আয়াত দ্বারা দলিল পেশ করে থাকেন। ইউসুফ (আ.) এর পানপাত্র হারিয়ে ফেলা সম্পর্কে কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘তারা বলল, আমরা বাদশাহর পানপাত্র হারিয়ে ফেলেছি এবং যে-কেউ এটা এনে দেবে, সে এক উটের বোঝা পরিমাণ মাল পাবে এবং আমি এর জামিনদ্বার।’ যে ব্যক্তি বাদশাহর হারানো পেয়ালা এনে দেবে, সে এক উট বোঝাই রেশন পাবে। এখানে যে চুক্তি হলো তাতে মেয়াদ ও পরিশ্রম কিছুই নির্ধারণ করা হয়নি। বরং কাজের শেষে পারিশ্রমিক ধার্য করা হয়েছে। এটাকেই জাআলা বলে। ঘটনাটি পূর্ববর্তী শরিয়তের হলেও তা আমাদের জন্য ততক্ষণ পালনীয়, যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের শরিয়তে নিষিদ্ধ না হয়। আর নিষিদ্ধতার কোনো দলিল না থাকায় জায়েজ হওয়াই প্রমাণিত হলো।
পারিশ্রমিক নির্দিষ্ট হওয়ার দুটি পদ্ধতি। যথাÑ
ক. পরিমাণ নির্দিষ্ট করা। যেমন খালেদ বকরের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হলোÑ সে বকরকে জমি কিনে দেবে। বিনিময়ে বকর তাকে ৫ হাজার টাকা দেবে।
খ. দামের অংশ নির্দিষ্ট করা। যেমন জায়েদ ওমরের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হলোÑ সে ওমরের গরু যত টাকায় বিক্রি করে দেবে তা থেকে শতকরা ৫ টাকা হারে ওমর তাকে পারিশ্রমিক দেবে। দালালের উপরোক্ত উভয় ধরনের পারিশ্রমিক হালাল। এমনকি পারিশ্রমিকের পরিমাণ নির্দিষ্ট করে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ থাকলে একটি মাল বেচাকেনা করে দিয়ে উভয় পক্ষ থেকে দালালি মূল্য গ্রহণ করাও হালাল হবে।
নিষিদ্ধ দালালি
যদি বিনিময় অনির্দিষ্ট রেখে বেচাকেনায় সহযোগিতার চুক্তি করা হয়, তাহলে চুক্তি ও বিনিময় সবই নাজায়েজ হবে। যেমনÑ রাশেদ বকরকে বলল, আপনি আমার এ গাড়ি বিক্রি করে আমাকে ২ লাখ টাকা দেবেন। এর বেশি যত টাকায় বিক্রি করতে পারবেন, তা আপনার থাকবে। যুগ শ্রেষ্ঠ ফকিহ মুফতি রশীদ আহমদ (রহ.) শেষোক্ত এ পদ্ধতিকে নাজায়েজ আখ্যা দিয়েছেন। অনুরূপভাবে গোপন দালালিও নাজায়েজ। যেমনÑ রাশেদ একটি পুরোনো মোবাইল বিক্রি করবে। কিন্তু তার ধারণা, এ ধরনের মোবাইল বর্তমানে কেউ কিনতে আগ্রহী হবে না। অপরদিকে বকর ঠিক সে ধরনেরই একটি মোবাইল খোঁজছে। জায়েদ এ সুযোগে দালালির মাধ্যমে উপার্জনের ইচ্ছা গোপন করে বন্ধুত্বের বেশ ধরে উভয়ের কাছে গিয়ে বেচাকেনার বিষয়টি চূড়ান্ত করল। মোবাইল কিনে দেওয়ার কথা বলে বকরের কাছ থেকে কিছু টাকা গ্রহণ করল। আবার বিক্রি করার কথা বলে রাশেদের কাছ থেকে কিছু টাকা গ্রহণ করল। এভাবে সে উভয় দিক থেকে টাকা খেল। কিন্তু বিষয়টি উভয় পক্ষের কেউই জানল না। এ অবস্থায় জায়েদের জন্য ওই টাকা হারাম হবে। আরেক ধরনের কৃত্রিম দালাল রয়েছেন, যারা শুধু দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্যে আসল খরিদ্দারের সামনে খরিদ্দার সেজে পণ্যের দাম করে আসল খরিদ্দারকে ধোঁকা দেন। এভাবে তারা বিক্রেতার কাছ থেকে চুক্তি অনুসারে কিছু টাকা গ্রহণ করে থাকেন। ইসলামে কোনো ধোঁকাবাজির সুযোগ নেই। কাউকে ধোঁকা দিয়ে উপার্জিত সম্পদ কখনও হালাল নয়। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি মুসলমানদের ধোঁকা দিল, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (মুসলিম : ১৬৪)।
মোটকথা, সব ধরনের ধোঁকা ও প্রতারণা পরিহার করে স্বচ্ছতা বজায় রেখে সেবার মানসিকতা নিয়ে দালালিতে লিপ্ত হলে তাতে দোষের কিছুই নেই। বরং এটি একটি সম্মানজনক পেশা হতে পারে।

লেখক : সম্পাদক, মাসিক আরবি ম্যাগাজিন আলহেরা

Leave a Reply

৯৭/৩/খ, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬
মোবাইলঃ ০১৭১২-৬৪৩৬৭৩, বার্তা বিভাগঃ ০১৭১২-৬৪৪৩৫০, সার্কুলেশন বিভাগঃ০১৯১৬০৯৯০২০
ইমেইলঃ [email protected], [email protected]

সম্পাদক:
মোঃ সুলতান চিশতী

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ
মহসিন হাসান খান (বুলবুল)

নির্বাহী সম্পাদকঃ
মোঃ ইব্রাহিম হোসেন

সহকারী সম্পাদকঃ
মোঃ আতোয়ার হোসেন

আইন উপদেষ্টাঃ
শাহিন সরকার


.: Developed By :.
Great IT