১৮ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, হেমন্তকাল

ট্রাম্প ও তাঁর চরকি

প্রকাশিতঃ জানুয়ারি ৫, ২০১৮, ১১:২৬ পূর্বাহ্ণ


ক্ষমতা নেওয়ার ৩৪৯ দিনে বিশ্বকে ভালোই নাচিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এখনো ঘোরাচ্ছেন তাঁর চরকি। কিন্তু একটি দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষের সমর্থন পাওয়া এই মানুষের কর্মকাণ্ড কি আসলেই তা, যা প্রচার হচ্ছে?

আবাসন, ক্যাসিনো আর হোটেল ব্যবসা করে জীবন কাটানো ট্রাম্প হঠাৎ রাজনীতিতে প্রবেশ করে হিলারিকে হারিয়ে পুরো বিশ্বকে চমকে দেন। এখনো তা চলছে এবং ক্ষণে ক্ষণে ভড়কে দিচ্ছেন প্রায় পুরো বিশ্বকে। চমকানো শুরু করেন হোয়াইট হাউসে বসার প্রথম সপ্তাহেই। ক্ষমতায় বসার তিন দিনের মাথায় ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপ (টিপিপি) চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেন।

সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার এশিয়াবিষয়ক নীতির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রসহ এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলের ১২টি দেশ এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। চুক্তির প্রধান লক্ষ্য স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করা। এই লক্ষ্যে দেশগুলোর মধ্যে বিনা শুল্কে বাণিজ্য চালু হয়। এ চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র থাকলে বিশ্বের মোট জিডিপির ৪০ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ২৭ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের ব্যবসা-বাণিজ্য হতো।

ট্রাম্প এর চার দিনের মধ্যে অধ্যাদেশ জারি করে মুসলিমপ্রধান সাতটি দেশের জনগণের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।

এ নিয়ে আইনি লড়াইয়ে হেরে গেলেও ইরাককে বাদ রেখে বাকি ছয়টি ইরান, সিরিয়া, সোমালিয়া, সুদান, লিবিয়া ও ইয়েমেনের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। আদালত তাঁর এমন পদক্ষেপ বারবার আটকে দিয়েছেন।

একই সপ্তাহে ট্রাম্প অভিবাসনবিষয়ক আরও দুটি নির্বাহী আদেশে সই করেন। একটিতে যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের নির্দেশ আর অপরটিতে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী অভিবাসীদের রাষ্ট্রীয় সহায়তার পরিসর সীমিত করা।

জলবায়ু চুক্তি থেকে বের হওয়া
গেল বছরের ১ জুন জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টিকে ‘নিছক ধাপ্পাবাজি’ আখ্যা দিয়ে ২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে নিজের দেশকে সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেন ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রসহ ১৮৮টি দেশ এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল। এর আওতায় বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি এমন পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছিল।

কিমের সঙ্গে বাগ্‌যুদ্ধ
গেল বছরে বিশ্ববাসী কিছুটা উদ্বিগ্ন ছিলেন, ট্রাম্প-কিমের বিরুদ্ধে না আবার পারমাণবিক যুদ্ধ বাধিয়ে বসেন! পিয়ংইয়ংয়ের গুয়াম দ্বীপে মিসাইল হামলার হুমকির প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছিলেন, উত্তর কোরিয়া এমন হুমকি দেওয়া অব্যাহত রাখলে ‘আগুন ও বারুদে’ জবাব দেওয়া হবে। কিন্তু তা হয়নি। উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক ক্ষেত্রে বিস্তর অগ্রগতি অর্জন করলেও ট্রাম্পের চাপে জাতিসংঘের আরোপ করা নিষেধাজ্ঞায় দেশটির অর্থনীতির অবস্থা চিড়েচ্যাপটা হওয়ার মতো। কোণঠাসা অবস্থায় উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উন নতুন বছরের বার্তায় নিজের অবস্থান বদলানোর আভাস দেন।

তবে পারমাণবিক বোমা নিয়ে পাল্টাপাল্টি হুমকি কিন্তু চলছেই। কিম যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে হুমকি দিয়েছেন, পারমাণবিক বোমা ছোড়ার বোতাম তাঁর অফিস কক্ষের টেবিলেই থাকে। পাল্টা জবাবে ট্রাম্প হুমকি দেন, তাঁর বোতামটা উনের বোতামের চেয়ে বড় এবং আরও শক্তিশালী।

ওবামার নীতি বাতিল
২০১২ সালে বারাক ওবামার চালু করা বহুল আলোচিত ডিফারড অ্যাকশন ফর চাইল্ড হুড অ্যারাইভালস (ডিএসিএ) নীতি বাতিল করেন ট্রাম্প। এমনকি ছুরি চালান বারাক ওবামার জনপ্রিয় স্বাস্থ্যনীতি ওবামাকেয়ারের বুকেও। তবে ট্রাম্পের প্রস্তাবিত নতুন স্বাস্থ্যনীতি প্রতিনিধি পরিষদে ভোটাভুটিতে উতরে গেলেও সিনেটে গিয়ে আটকে যায়।

কাতার সংকটে ভূমিকা
কাতার সন্ত্রাসবাদের মদদ দিচ্ছে—এমন অভিযোগে ৫ জুন দেশটির সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষণা দেয় সৌদি আরব, আরব আমিরাত, বাহরাইন ও মিসর। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের হঠকারিতায় দেশটি সমর্থন দিচ্ছে—এমন অভিযোগও তোলা হয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রাথমিকভাবে এই অবরোধে সমর্থন দেন।

ইরানের সঙ্গে চুক্তিতে সইয়ে অস্বীকৃতি
ছয় বিশ্ব শক্তি ও ইরানের মধ্যে ২০১৫ সালে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পারমাণবিক কর্মসূচি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমিয়ে আনার বিনিময়ে ইরানকে অর্থনৈতিক অবরোধ থেকে মুক্তি দেওয়া হয় এ চুক্তিতে। আর বর্তমানে ইরানে চলমান বিক্ষোভে মদদ দেওয়ারও অভিযোগ আছে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে।

প্রথম বিদেশ সফর
প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম বিদেশ সফরে সৌদি আরব যান ট্রাম্প। ২০ থেকে ২৭ মে সৌদি আরব, ইসরায়েল, পশ্চিম তীর, ইতালি, ভ্যাটিকান সিটি ও বেলজিয়াম সফর করেন। রিয়াদে আরব ও মুসলিমপ্রধান কয়েকটি দেশের নেতাদের সম্মেলনে অংশ নেন ট্রাম্প। এর ফল আজ পাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য। কারণ, তিনি জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানীর ঘোষণা দিয়ে ওই অঞ্চলকে অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিয়েছেন।

জেরুজালেম ইসরায়েলের রাজধানী
কয়েক শতকের মার্কিন নীতি লঙ্ঘন করে জেরুজালেমকেই ইসরায়েলের রাজধানী ঘোষণা দেন ট্রাম্প। তিনি মার্কিন দূতাবাস তেলাআবিব থেকে জেরুজালেমে সরিয়ে নেওয়ারও নির্দেশ দেন। এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সরব হয় পুরো বিশ্ব। ওআইসিও জরুরি বৈঠকে বসে ট্রাম্পের জেরুজালেম ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করে পূর্ব জেরুজালেমকে ফিলিস্তিনের রাজধানী ঘোষণা করে। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ট্রাম্পের ঘোষণার তীব্র নিন্দা জানায়। কয়েকটি ছাড়া প্রায় সব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। কিন্তু সিদ্ধান্তে অনড় ট্রাম্প। বিরুদ্ধে মতো প্রকাশকারী দলগুলোকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।

হিলারি ক্লিনটনের মতো কূটনীতিবিদ ও ঝানু রাজনীতিবিদকে হারিয়ে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দেশের রাজনীতির ব্যাটন নিজ হাতে নেওয়া নবিশ ট্রাম্পের আগমনকে ‘ওভার ট্রাম্প’ বলা যেতেই পারে। ২০১৭ সালের ২০ জানুয়ারি হোয়াইট হাউসে বসেই ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ (সবার আগে যুক্তরাষ্ট্র) নীতির ঘোষণা দিলেও বছর শেষে আনাড়ি এই খেলোয়াড়ের কর্মকাণ্ডের কারণে অনেকেই ‘সবার আগে ট্রাম্প’ বলে থাকতে পারেন।

দেশটির অধিকাংশ মূলধারার পত্রপত্রিকা ও টেলিভিশনগুলো ট্রাম্পকে এখনো হাস্যকর কিছু ছাড়া ভাবে না। কিন্তু নিজের লক্ষ্যে পূরণে কাউকে তোয়াক্কা না করা ট্রাম্প সম্পর্কে দেশটির প্রভাবশালী গণমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস স্বীকার করে বলেছে, ট্রাম্পের প্রভাবে ব্যবসায়ীদের মধ্যে নতুন কর্মচাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। রক্ষণশীলদের অন্যতম ভাষ্যকার রজার কিম্বেল পর্যন্ত বলেছেন, ট্রাম্পকে এখন কিছুটা ‘সিরিয়াসলি’ নেওয়ার সময় এসেছে। কারণ হিসেবে দেখা যেতে পারে, ট্রাম্পের শক্ত অবস্থানের কারণে উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতি নাস্তানাবুদ অবস্থায় পৌঁছানোর দার প্রান্তে।

এখন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় জনমতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থন মধ্য-তিরিশ শতাংশে। শুরুর ট্রাম্পের সঙ্গে বছর শেষে ট্রাম্পের পার্থক্য কিন্তু এখানেই। কারণ, ক্ষমতা গ্রহণের বছর খানেকের মাথায় ট্রাম্প নিজের অবস্থান অনেক সংহত করে ফেলেছেন। কেননা, ট্রাম্পের সময় পুঁজি বিনিয়োগ ৬ দশমিক ২ শতাংশ উল্লম্ফন হয়েছে।

ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করতে আগ্রহী। খুব বেশি দায়িত্বসম্পন্ন না হলেও কিছুটা গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করছেন।

৩৪৯ দিনে ১ হাজার ৯৫০টি ভুল করা প্রেসিডেন্ট টুইট বেশি করার কারণে সমালোচনা হলেও এই টুইটের কারণেই যেকোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের চেয়ে ট্রাম্প হোয়াইট হাউসকে নাগরিকদের অনেক বেশি কাছে নিতে পেরেছেন। ভবিষ্যতেও আরও পারবেন—এ কথা বলা যায়।

Leave a Reply

৯৭/৩/খ, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬
মোবাইলঃ ০১৭১২-৬৪৩৬৭৩, বার্তা বিভাগঃ ০১৭১২-৬৪৪৩৫০, সার্কুলেশন বিভাগঃ০১৯১৬০৯৯০২০
ইমেইলঃ [email protected], [email protected]

সম্পাদক:
মোঃ সুলতান চিশতী

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ
মহসিন হাসান খান (বুলবুল)

নির্বাহী সম্পাদকঃ
মোঃ ইব্রাহিম হোসেন

সহকারী সম্পাদকঃ
মোঃ আতোয়ার হোসেন

আইন উপদেষ্টাঃ
শাহিন সরকার


.: Developed By :.
Great IT