২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ৯ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, শরৎকাল

জয়-পরাজয় ঠিক করবেন তরুণ ভোটাররা

প্রকাশিতঃ মে ১২, ২০১৮, ২:৩৯ অপরাহ্ণ


একযাত্রায় দুই ফল’ বলে যে বাংলা প্রবাদটি চালু আছে, নির্বাচন কমিশন সেটাই ফের দেখাল খুলনা ও গাজীপুরে। তারা একই দিন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করল, প্রার্থীরা প্রচারকাজ চালালেন, কিন্তু দুই সিটিতে একসঙ্গে নির্বাচনটি করতে পারল না। গাজীপুরে নির্ধারিত দিনে নির্বাচন না হওয়ার জন্য ইসি আদালতের দোহাই দিলেও নিজের দায় এড়াতে পারে না। আপিল বিভাগ যেদিন নির্বাচনের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিল, তার আগের দিন প্রধান নির্বাচন কমিশনার দেশবাসীকে জানিয়ে দিলেন, ১৫ মে গাজীপুরে নির্বাচন করা সম্ভব নয়। এখন নতুন তারিখ হবে। প্রার্থীদের নতুন করে প্রচারে নামতে হবে। কিন্তু মাঝখানে গাজীপুরের মানুষের যে ক্ষতিটা হয়ে গেল, তা পূরণ করবে কে? দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের দায়িত্বহীনতার কারণে আমাদের জাতীয় জীবনে অনেক অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, হচ্ছে। কিন্তু রাষ্ট্রের ও জনগণের চালকেরা বরাবরই একে রবীন্দ্রনাথের ‘সামান্য ক্ষতি’ কবিতার রাজমহীয়সীর মতো বলেন, ‘ও এমন কিছু না।’ মাননীয় আদালত হাত কাটা পড়া রাজীবের জন্য এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে বলেছেন বাসের মালিককে। কিন্তু এ বি এম আজহারুল ইসলাম নামের এক ভদ্রলোক গাজীপুরবাসীর যে ক্ষতি করলেন, সেটি পূরণ করতেও কি আমরা আদালতের কাছে আরেকটি আদেশ আশা করতে পারি না?

ঢাকা উত্তর ও গাজীপুরের নির্বাচন নিয়ে আদালতে করা রিটের পর মানুষের মনে এই ধারণা হওয়াও অস্বাভাবিক নয় যে, সরকার যখন যেখানে নির্বাচন চায়, সেখানে নির্বাচন হয়। যখন চায় না, নির্বাচন হয় না। এর আগে কয়েক বছর ঢাকা সিটির নির্বাচন আটকে রাখা হয়েছিল তথাকথিত সীমানাসংক্রান্ত জটিলতার কারণে। এমনকি সিটি করপোরেশন উত্তর-দক্ষিণে ভাগ হওয়ার পরও অনেক দিন প্রশাসক দিয়ে চালানো হয়েছে। যেখানে সংবিধানের দোহাই দিয়ে অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা হলো, সেখানে কীভাবে অনির্বাচিত প্রশাসক দিয়ে স্থানীয় সরকারের কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান চলতে পারে? আর জনগণ যাঁকে নির্বাচিত করেন, একজন যুগ্ম সচিবের সই করা কাগজ দিয়ে তাঁকে পদচ্যুত করা আইনের অপপ্রয়োগও বটে। ২০১৩ সালের নির্বাচনে পাঁচ সিটিতেই বিএনপি-সমর্থিত (তখনো দলীয় প্রতীকে নির্বাচন চালু হয়নি) প্রার্থী জয়ী হলেও একজন ছাড়া বাকি চারজনকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের আদেশে পদচ্যুত করা হয়েছিল। পরে উচ্চ আদালতে গিয়ে তাঁরা সবাই পদ ফিরে পেয়েছেন। গাজীপুরের বিষয়ে যদি এক সপ্তাহের মধ্যে আইনি জটিলতা কাটানো সম্ভব হয়, ঢাকা উত্তরের জটিলতা কেন গত পাঁচ মাসেও কাটল না, সেই কৈফিয়ত ইসিকে দিতে হবে।

কোন নির্বাচন কখন হবে সেটি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, নির্বাচনটি কেমন হবে। ৭ মে খুলনায় প্রথম আলোর গোলটেবিল বৈঠকের শিরোনামও ছিল, ‘কেমন নির্বাচন চাই’। ভোটার, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি-সবাই বলেছেন, ভালো নির্বাচন চাই। সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন চাই, যাতে ভোটাররা নির্বিঘ্নে গিয়ে ভোট দিতে পারেন।

খুলনার নির্বাচন প্রথম দিকে কিছুটা নিরুত্তাপ থাকলেও এখন ‘যুদ্ধাবস্থা’ চলছে। দুই দিন পরই ভোট। তারিখ যতই এগিয়ে আসছে, ততই অস্থিরতা-উৎকণ্ঠা লক্ষ করা যাচ্ছে। এসব রহিত করা যাদের দায়িত্ব, সেই নির্বাচন কমিশনের কর্তাব্যক্তিরাও মনে হচ্ছে কারও অঙ্গুলি হেলনে চলছেন। তাঁরা যখন একটি দলের অভিযোগের ভিত্তিতে সেখানে ‘বিশেষ দূত’ বা সহকারী পাঠান এবং আরেকটি দলের অভিযোগকে আমলেই নেন না, তখন কীভাবে বলা যাবে ইসি নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করছে। নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে নালিশ-পাল্টা নালিশের ঘটনা বাংলাদেশে নতুন নয়। একে অপরকে চাপে ফেলতে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও দল এসব করে থাকে। কিন্তু নির্বাচনের যিনি রেফারি, অর্থাৎ নির্বাচন কমিশনকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে সবকিছু বিচার-বিশ্লেষণ করেই। কারও দিকে তার পক্ষপাত দেখানোর সুযোগ নেই।

খুলনায় এবার ৪ লাখ ৯৩ হাজার ভোটার একজন মেয়র ও ৪১ জন কাউন্সিলরকে বেছে নেবেন। ২০১৩ সালেও তাঁরা নিয়েছিলেন। তখনো আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল এবং খুলনাবাসী বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীকেই বেছে নিয়েছিলেন। এবার কাকে বেছে নেবেন-এই জল্পনাই মানুষের মনে। খুলনায় ভোটার কম হলেও দেশের তৃতীয় বৃহত্তম নগরী। লোকসংখ্যা পনের লাখের মতো। স্থানীয়রা জানান, খুলনায় যাঁরা থাকেন, তাঁদের অনেকেই আশপাশের উপজেলার মানুষ। তাঁরা শহরের ভোটার হয়ে নিজ নিজ এলাকায় ভোটার হন। এ কারণে ভোটার সংখ্যা তুলনামূলক কম। কয়েক বছর আগে প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি শিশির মোড়ল খুলনায় জনসংখ্যা কমছে বলে একটি রিপোর্ট করেছিলেন। এর মূলে ছিল জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা ও শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া। সেই অবস্থা থেকে খুলনা বেরিয়ে আসতে পেরেছে। এটি আশার দিক। খুলনা এলাকায় এখন অনেক উন্নয়নমূলক কাজ হচ্ছে। মোংলা বন্দর সচল হওয়ার পর এই অঞ্চলে অর্থনীতির গতি বেড়েছে। নতুন নতুন শিল্পকারখানাও গড়ে উঠেছে।

খুলনা সিটি নির্বাচনকে ক্ষমতাসীনেরা প্রথম থেকেই স্থানীয় বিষয় হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। তারা মনে করে, বিএনপি প্রার্থীর চেয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর অভিজ্ঞতা ও জনপ্রিয়তা বেশি। তিনি শেখ হাসিনার প্রথম সরকারে প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। পরে খুলনা সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করেছেন। জাতীয় সংসদের সদস্য পদে ইস্তফা দিয়ে তিনি দ্বিতীয়বার মেয়র নির্বাচন করছেন। নির্বাচনী প্রচারে তাদের প্রধান আরজি হলো, সরকারে আওয়ামী লীগ আছে। অতএব আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে জয়ী করলে খুলনায় বেশি উন্নয়ন হবে। এই ধারণা সত্য হলে সব স্থানীয় সরকার সংস্থায়ই সরকারদলীয় প্রার্থীর জয়ী হওয়ার কথা। বাস্তবে তা হয়নি। আওয়ামী লীগ যে খুলনার নির্বাচনকে শেষ পর্যন্ত স্থানীয় বিষয় হিসেবে রাখতে পারেনি, তারও কারণ ক্ষমতাসীনেরা। তারা যখন যুক্তি দেয় সরকারে থাকলে উন্নয়ন হবে, না থাকলে হবে না, তখন সেটি জাতীয় ইস্যু হয়ে যায়।

অন্যদিকে রাজনৈতিক কারণেই বিএনপি এই নির্বাচনকে জাতীয় ইস্যু হিসেবে দেখাতে চাইছে। নেতারা খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছেন। ভোটারের কাছে তাঁরা এই বক্তব্য দেওয়ার চেষ্টা করেছেন যে জেল-জুলুম সত্ত্বেও তাঁরা নির্বাচনী লড়াইয়ে আছেন। খুলনায় বিএনপি জয়ী হলে খালেদার পাশাপাশি ‘গণতন্ত্রও’ মুক্ত হবে।

খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে পাঁচজন মেয়র প্রার্থী থাকলেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে আওয়ামী লীগের তালুকদার আবদুল খালেক ও বিএনপির নজরুল ইসলামের মধ্যে। আবার এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ব্যক্তি ইমেজ না দলীয় জনপ্রিয়তা বেশি কাজ করবে, সেটি এখনো পরিষ্কার নয়। দৃশ্যত প্রচারে নৌকা এগিয়ে। আবার ভেতরে-ভেতরে ধানের শীষেরও জোর প্রচার চলছে। কর্মীরা রাতে পালিয়ে থাকলেও দিনে প্রচারে নামছেন। তাঁরা মনে করছেন, শেষ তিন দিন খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
সাধারণ ধারণা হলো, খুলনায় বিএনপি-জামায়াতের সমর্থক বেশি। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের সুবর্ণ সময়েও শহর এলাকায় বিএনপির প্রার্থীই (নজরুল ইসলাম) জিতেছিলেন। জামায়াতের ১৭ হাজার ভোট আছে, যার পুরোটাই বিএনপি পাবে বলে মনে করে। অন্যদিকে সংখ্যালঘু ভোট আছে প্রায় ৫০ হাজার। আওয়ামী লীগের ধারণা, এ ভোটের পুরোটা নৌকায় যাবে। তবে এই যোগ-বিয়োগের বাইরে নির্বাচনী ফলাফলে যাঁরা সবচেয়ে বেশি নিয়ামক ভূমিকা রাখবেন, তাঁরা হলেন তরুণ ভোটার।

আমরা পাঁচ মেয়র প্রার্থীর নির্বাচনী ইশতেহার পরখ করে দেখেছি। সবাই ভালো ভালো কথা লিখেছেন। উন্নয়নের গালভরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। খুলনাকে তিলোত্তমা নগরী হিসেবে সাজানোর কথা বলেছেন। কিন্তু তাঁদের ইশতেহারে তরুণদের মনে আশা জাগাতে পারে-এমন কোনো পদক্ষেপ বা পরিকল্পনা আছে, সেটি মনে হয়নি। শুধু একজন বিনা পয়সায় ওয়াই-ফাই তথ্যসেবা দেওয়ার কথা বলেছেন।

গত ১০ বছরে খুলনায় অন্তত ১ লাখ নতুন ভোটার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে দল করেন, এমন তরুণের সংখ্যা কম। দলীয় বৃত্তের বাইরেই রয়ে গেছেন বেশির ভাগ তরুণ। এঁদের হাতেই আছে বিজয়ের চাবিকাঠি। দেখা যাক, এই তরুণেরা ১৫ মে কার হাতে তুলে দেন খুলনা সিটি করপোরেশন বা কেসিসির চাবি?

সোহরাব হাসান: প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি
sohrabhassan 55 @gmail. com

Leave a Reply

৯৭/৩/খ, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬
মোবাইলঃ ০১৭১২-৬৪৩৬৭৩, বার্তা বিভাগঃ ০১৭১২-৬৪৪৩৫০
ইমেইলঃ [email protected], [email protected]

সম্পাদক:
মোঃ সুলতান চিশতী

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ
মহসিন হাসান খান (বুলবুল)

নির্বাহী সম্পাদকঃ
মোঃ ইব্রাহিম হোসেন

সহকারী সম্পাদকঃ
মোঃ আতোয়ার হোসেন

আইন উপদেষ্টাঃ
শাহিন সরকার


.: Developed By :.
Great IT