২১শে নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, হেমন্তকাল

জামায়াত নিয়ে নতুন ভাবনায় বিএনপি

প্রকাশিতঃ জুলাই ৫, ২০১৮, ১:০৭ অপরাহ্ণ


জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে আসার মুহূর্তে জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে নতুন করে ভাবনায় পড়েছে বিএনপি। স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচনে জামায়াত বিএনপিকে সমর্থন করে এলেও সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী দিয়ে হঠাৎ নড়েচড়ে বসার চেষ্টা করছে। বিএনপি মনে করছে, এটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আসন নিয়ে দর-কষাকষির একটি ইঙ্গিত।
সিলেট ছাড়াও রাজশাহী ও বরিশাল সিটি করপোরেশনেও জামায়াত মেয়র পদে বিএনপির আগেই প্রার্থী দিয়ে মাঠে নেমেছে। এর মধ্যে সিলেটের ব্যাপারে জামায়াতের মনোভাব শক্ত। তারা দলীয় প্রার্থী এহসান মাহবুব জোবায়েরকে সরাতে চায় না। সেখানে বিএনপি বর্তমান মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে প্রার্থী করেছে। তাঁর বিরুদ্ধে প্রার্থী দাঁড় করিয়ে জামায়াতের নাছোড় অবস্থান নেওয়াকে ভালোভাবে নিচ্ছেন না বিএনপির নীতিনির্ধারকেরা। তাঁরা এই সময়ে জোটের প্রধান দুটি দলের মধ্যে এ ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে ২০-দলীয় জোটের ভেতরে দ্বন্দ্ব ও সন্দেহ তৈরির সূত্রপাত হিসেবে দেখছেন।
এ ছাড়া বিএনপি যে আগামী সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য গড়ার চেষ্টা করছে, জামায়াতের হঠাৎ করে নড়েচড়ে বসার চেষ্টা সেই ঐক্য প্রচেষ্টায় ব্যাঘাত সৃষ্টির কৌশল থেকে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ দেখা দিয়েছে। বিএনপির নেতাদের কারও কারও ধারণা, এসব ব্যক্তি বা দলের সঙ্গে বিএনপির ঐক্য হলে জামায়াত জোটে গুরুত্বহীন হয়ে পড়বে। তাতে আগামী জাতীয় নির্বাচনে তাদের আগের অবস্থান নষ্ট হবে। এ কারণে জামায়াত সিলেটে আলাদা নির্বাচন করে বিএনপিকে একটা ইঙ্গিত দিয়ে রাখছে। আবার জামায়াতের কারণে বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হতে ওই দলগুলোরও আপত্তি আছে বলে কথা-বলাবলি আছে। তাই বিএনপিও বৃহত্তর স্বার্থে আপাতত জামায়াতকে পেছনে রেখে জাতীয় ঐক্য গড়তে চাইছে বলে জানা গেছে।

অবশ্য এ বিষয়ে জামায়াতের নায়েবে আমির মিয়া গোলাম পরওয়ার গতকাল ঢাকার একটি গণমাধ্যমকে বলেছেন, জাতীয় ঐক্যে জামায়াত সমস্যা, এমন আলোচনা তাঁদের কাছে আসেনি। তাঁরাও আদর্শিক কারণে সবার সঙ্গে জোট করতে পারেন না, এমন দৃষ্টিভঙ্গি তো তাঁদেরও থাকতে পারে। তবে তিনি বলেন, এই সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের যদি একটি দফার বিষয়ে ঐকমত্য থাকে, তাহলে জোটে জোটে লিয়াজোঁ হয়ে আন্দোলন হতে পারে।
২৬ জুলাই সিলেট, রাজশাহী ও বরিশাল সিটি করপোরেশনে নির্বাচন। বিএনপি সিলেটে আরিফুল হক চৌধুরী, রাজশাহীতে মো. মোসাদ্দেক হোসেন ও বরিশালে মজিবুর রহমান সারোয়ারকে প্রার্থী করেছে। তিন সিটিতেই জামায়াত মেয়র পদে বিএনপির আগেই প্রার্থী দিয়ে মাঠে নেমেছে। বরিশাল ও রাজশাহীতে জামায়াত মেয়র পদে যথাক্রমে মুয়ায্‌যম হোসাইন ও সিদ্দিক হোসেনকে প্রার্থী করে প্রচারে নেমেছে। এই দুই সিটিতে জামায়াত প্রার্থী সরিয়ে নেবে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। কিন্তু সিলেটের ব্যাপারে তাদের অবস্থান ভিন্ন। তাদের যুক্তি, গাজীপুর ও খুলনা, তার আগে ঢাকা, রংপুরসহ সব সিটি করপোরেশন নির্বাচনেই তারা বিএনপিকে সমর্থন দিয়ে আসছে। সিলেটে তারা এর প্রতিদান চান। এ লক্ষ্যে জামায়াত দলের সিলেট মহানগর কমিটির আমির এহসান মাহবুব জোবায়েরকে প্রার্থী করে।
জামায়াতের নীতিনির্ধারকেরা মনে করছেন, অন্য সিটির তুলনায় সিলেটে তাঁদের সাংগঠনিক অবস্থান ভালো। তবে দলটির দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানায়, সিলেটে প্রার্থী দিয়ে অনমনীয় অবস্থান নেওয়ার পেছনে দলের সেক্রেটারি জেনারেল শফিকুর রহমানের আগ্রহ বেশি কাজ করেছে। এর নেপথ্যে আওয়ামী লীগের স্থানীয় এক নেতার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক কাজ করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়।
আওয়ামী লীগের সেই নেতার নাম উল্লেখ করে এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিলেটে জামায়াতের মেয়র প্রার্থী এহসান মাহবুব জোবায়ের প্রথম আলোকে বলেন, অন্য জায়গার তুলনায় সিলেটে রাজনৈতিক সম্প্রীতি একটু ভালো। তাই সবার সঙ্গেই রাজনৈতিক সম্পর্ক আছে। তবে তিনি তাঁর প্রার্থী হওয়া সেক্রেটারি জেনারেল নয়, দলীয় সিদ্ধান্ত বলে দাবি করেন।
গতকাল বুধবার গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে তিন সিটির নির্বাচন নিয়ে ২০-দলীয় জোটের বৈঠক হয়। জানা গেছে, বৈঠকে মূল আলোচনা ছিল সিলেটের জামায়াতের নির্বাচন প্রসঙ্গ। সেখানে উপস্থিত জামায়াতের প্রতিনিধি আবদুল হালিম প্রার্থী প্রত্যাহার না করার মনোভাব ও যুক্তি দেখান। যদিও বৈঠক শেষে জোটের সমন্বয়ক বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান সব সিটি করপোরেশনে ২০ দলের একক প্রার্থী থাকার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা দেন।
জামায়াতের প্রার্থিতার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে নজরুল ইসলাম খান সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময় এখনো শেষ হয়নি। আমরা বলেছি যে প্রার্থী একজনই থাকবেন।’
বৈঠকে থাকা ২০ দলের দায়িত্বশীল একাধিক নেতার সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির মহাসচিব বৈঠকে উল্লেখ করেন যে আরিফুল হক চৌধুরী জনপ্রিয় মেয়র ছিলেন। তিনি গত নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন। এ সময় জামায়াতের প্রতিনিধি আবদুল হালিম বলেন, বিএনপি বড় দল। তাদের অনেক ভোট আছে। জামায়াতের ভোট না পেলেও সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তা ছাড়া সবখানেই জোটবদ্ধ নির্বাচন হয়েছে, সিলেটে আলাদা নির্বাচন হলে অসুবিধা কী?
বৈঠকে থাকা জোটের শরিক দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব শাহাদাত সেলিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ব্যাপারটি নিয়ে জোটে অস্বস্তি দেখা দিয়েছে। আমরা এই সংকটকালীন সময়ে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে জামায়াতকে অনুরোধ করেছি।’
বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, শেষ পর্যন্ত জামায়াত সিলেটের নির্বাচন থেকে না সরলে ধরে নিতে হবে, এই অবস্থানের পেছনে তাদের রাজনৈতিক কৌশল আছে। তা হচ্ছে আগামী জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতের অবস্থান কী হতে পারে, তার পূর্বাভাস মিলতে পারে সিলেটের নির্বাচন থেকে। ইতিমধ্যে জামায়াত সিটি নির্বাচনে আগাম মেয়র প্রার্থী ঘোষণার মতো জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়েও একই ধরনের কৌশল নিয়েছে। দলটি ৭০ থেকে ৮০টি আসনে প্রার্থী মনোনয়ন চূড়ান্ত করে তাঁদের এলাকায় কাজ করার জন্য নির্দেশনা দিয়েছে। এসব প্রার্থীর অনেকে নিজ নিজ এলাকায় পোস্টার ছেপে প্রার্থিতা জানান দিয়েছেন।
যদিও রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন। দলটিকে এখন হয় জোটগতভাবে ধানের শীষ প্রতীকে, অথবা স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করতে হবে। জোটগত রাজনীতিতে থাকলেও জামায়াত স্বতন্ত্রভাবেও ভোট করার একটা প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে দলটির একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে।
এহসান মাহবুব জোবায়ের প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা জোটের প্রার্থী হতে চাচ্ছি। কারণ আমরা বরিশাল, রাজশাহী, খুলনা, গাজীপুর সবখানেই তো বিএনপিকে সমর্থন দিয়েছি। বিনিময় চাইনি। তাই সমঝোতা না হলে আমরা আলাদা নির্বাচন করব।’
এ বিষয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আমাদের ২০ দলের বক্তব্য হচ্ছে আমরা একক প্রার্থী নিয়েই নির্বাচন করব। আমরা কথাবার্তা বলছি। আশা করি সমাধান হয়ে যাবে।’

Leave a Reply

৯৭/৩/খ, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬
মোবাইলঃ ০১৭১২-৬৪৩৬৭৩, বার্তা বিভাগঃ ০১৭১২-৬৪৪৩৫০, সার্কুলেশন বিভাগঃ০১৯১৬০৯৯০২০
ইমেইলঃ [email protected], [email protected]

সম্পাদক:
মোঃ সুলতান চিশতী

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ
মহসিন হাসান খান (বুলবুল)

নির্বাহী সম্পাদকঃ
মোঃ ইব্রাহিম হোসেন

সহকারী সম্পাদকঃ
মোঃ আতোয়ার হোসেন

আইন উপদেষ্টাঃ
শাহিন সরকার


.: Developed By :.
Great IT