২১শে নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, হেমন্তকাল

ঘরের কোন্দলে অস্থির আ.লীগ

প্রকাশিতঃ জানুয়ারি ২৮, ২০১৮, ৫:২৪ অপরাহ্ণ


অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে সরকারি দল আওয়ামী লীগে। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল—সর্বত্রই দ্বন্দ্ব প্রকাশ্য হয়ে পড়ছে। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বছর বলে কারও বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিচ্ছে না দল। ভর্ৎসনা, অসন্তোষ প্রকাশ আর উপদেশ দেওয়ার মাধ্যমে আপস-মীমাংসার ওপরই জোর দিয়েছে দলটি।

সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রীয় উপকমিটির সহসম্পাদক নিয়োগ, নারায়ণগঞ্জ সিটির মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী ও সাংসদ শামীম ওসমানের সমর্থকদের মধ্যে সংঘাত, ঢাকার দুই মহানগর কমিটি নিয়ে দ্বন্দ্ব-সংঘাত দলের নীতিনির্ধারকদের ভাবনায় ফেলেছে। বঞ্চিতদের ক্ষোভের মুখে সহসম্পাদক নিয়োগ স্থগিত এবং নারায়ণগঞ্জে সংঘাত নিরসনে দলের সাধারণ সম্পাদককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ঢাকা মহানগর কমিটি নিয়ে জটিলতা নিরসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ফারুক খানকে। সব কটি ঘটনাতেই দলীয় প্রধান শেখ হাসিনাকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সূত্র বলছে, নির্বাচনের সময় ভালো-খারাপ সবাইকেই দরকার। তাই সবাইকে নিয়ে সমঝোতার মাধ্যমে চলার কৌশল নিয়েছে দল। গত শুক্রবার থেকে কেন্দ্রীয় নেতাদের সারা দেশে জেলা সফর শুরু হয়েছে। সমঝোতার মাধ্যমে কোন্দল মেটানো এসব সফরের অন্যতম লক্ষ্য।

বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিবেদন অনুসারে, গত বছর দেশে রাজনৈতিক সংঘাতে ৫২ জন নিহত হন। এর মধ্যে ৪০ জনই প্রাণ হারিয়েছেন আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সংঘাতে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ফারুক খান বলেন, পরিবারের মধ্যেও সমস্যা হয়। আওয়ামী লীগ একটা বড় পরিবার, এর মধ্যে মাঝেমধ্যে কিছু ভুল-বোঝাবুঝি হয়। যেখানে সাংগঠনিক সমস্যা, সেখানে সাংগঠনিক সমাধান দেওয়া হচ্ছে। যেটাতে আইনশৃঙ্খলাগত বিষয়, সেখানে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

আওয়ামী লীগের একজন কেন্দ্রীয় নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, টানা ৯ বছর দল ক্ষমতায় থাকার কারণে সব স্তরে ‘আমি কী পেলাম আর কী পেতে পারি’—এই প্রশ্নই মুখ্য হয়ে উঠেছে। ফলে দ্বন্দ্ব বহুমুখী রূপ নিয়েছে। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের পেছনে মোটা দাগে তিনটি কারণ রয়েছে। ১. জাতীয় বা স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন লাভ। ২. আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে ঠিকাদারি ও চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ। ৩. পদপদবি লাভ।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচিত প্রতিনিধি বা দলীয় পদ—দুটিই এখন অনেক সুবিধা পেতে সহায়তা করে। এটাকে বলা হয় ফায়দাভিত্তিক রাজনীতি। এর জন্য প্রাণপণ লড়াই হবেই। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, মাঠে প্রতিপক্ষ নেই। ফলে দলের মধ্যে যাঁরা অপেক্ষাকৃত ভালো, পেশিশক্তি নেই, তাঁদের বিতাড়িত করার চেষ্টা আছে। নির্বাচন এলে এসব চেষ্টা, দ্বন্দ্ব ও সংঘাত আরও বাড়তে পারে।

নারায়ণগঞ্জে দ্বন্দ্ব মিটছে না
নারায়ণগঞ্জে সেলিনা হায়াৎ আইভী ও শামীম ওসমানের দ্বন্দ্ব মিটে যাবে—আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বও এমনটা মনে করে না। এ অবস্থায় আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে সংঘাত এড়িয়ে চলার বিষয়ে দুই পক্ষকে উপদেশ-পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, আইভী ও সেলিম ওসমানের মধ্যে একে অপরকে বিরক্ত না করার একটা পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জে হকার উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে সংঘাত বাধিয়ে শামীম ওসমান তা পণ্ড করে দিয়েছেন। এ ঘটনায় দুই পক্ষের ওপরই কিছুটা বিরক্ত দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা। কারণ নির্বাচনের আগে হকার উচ্ছেদ করার প্রয়োজন মনে করেননি দলীয় প্রধান। আবার শামীম ওসমান নিজ নির্বাচনী এলাকার বাইরে কেন নাক গলাতে গেলেন, এই প্রশ্নও তুলেছেন প্রধানমন্ত্রী।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকেরা মনে করেন, শামীম ওসমান নারায়ণগঞ্জে পারিবারিক রাজনীতি করেন। অর্থাৎ নিজে আওয়ামী লীগের সাংসদ হওয়ার পর বড় ভাই সেলিম ওসমানের অবস্থানও যাতে নিশ্চিত থাকে। সেলিম ওসমান জাতীয় পার্টির সাংসদ। মূল লক্ষ্য হচ্ছে, শহর ও সিদ্ধিরগঞ্জ পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, আইভীর যে রাজনৈতিক দৃঢ়তা, তিনি শামীম ওসমানকে ছাড় দেবেন না। আর শামীম ওসমান পারিবারিক কর্তৃত্ব হারাতে চাইবেন না। কেন্দ্রীয় নেতারাও দুই পক্ষে বিভক্ত হওয়ার কারণে এই দ্বন্দ্ব শেষ হওয়ার নয়।

সহসম্পাদক নিয়ে কেন্দ্র বিভক্ত
উপকমিটির সহসম্পাদক নিয়োগের বিষয়টি বঞ্চিতদের ক্ষোভ-বিক্ষোভে সীমাবদ্ধ নেই। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা এই বিষয়ে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহসম্পাদকের যে তালিকা প্রকাশিত হয়েছে, এর দায়ভার কার—এই প্রশ্ন তুলেছেন ৩৪ সদস্যের আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সম্পাদকমণ্ডলীর অনেকে। পদবঞ্চিত সাবেক ছাত্রলীগ নেতাসহ সম্পাদকমণ্ডলীর অনেকে এই অবস্থার জন্য দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও দপ্তর সম্পাদক আবদুস সোবহানকে (গোলাপ) দোষছেন। বঞ্চিত নেতা-কর্মীরা গত সপ্তাহে পরপর দুই দিন দলের ধানমন্ডি কার্যালয়ে বিক্ষোভ করে এই দুজনের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন।

সম্পাদকমণ্ডলীর দুজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সহসম্পাদকের তালিকা করার এখতিয়ার দলের সভাপতি শেখ হাসিনার। কিন্তু এর আগে সম্পাদকমণ্ডলীতে এই নিয়ে আলোচনা করার রেওয়াজ আছে। কারণ সহসম্পাদকদের নিয়ে কাজ করবেন বিভাগীয় সম্পাদকেরা। তাই তাঁরা না জানলে কিংবা না চিনলে কাজ করা কঠিন। এ ছাড়া যুগ্ম সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকেরা সরাসরি সাধারণ সম্পাদকের অধীন। এসব পদের বিপরীতে সহসম্পাদক দেওয়ার কথা দলের গঠনতন্ত্রে নেই। ফলে কেন্দ্রীয় নেতাদের বেশির ভাগ সহসম্পাদক নিয়ে খুশি নন।

ঢাকা মহানগরে বিভক্তি
ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগে দ্বন্দ্ব পুরোনো। অবিভক্ত ঢাকা মহানগর কমিটি থাকা অবস্থাতেও সভাপতি ও সাবেক মেয়র মোহাম্মদ হানিফ এবং সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল। দুই পক্ষের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে সংঘর্ষও হয়েছে। মহানগর কমিটি উত্তর ও দক্ষিণে ভাগ করার পরও অবস্থার পরিবর্তন হয়নি।

২০১৬ সালের ১০ এপ্রিল উত্তর ও দক্ষিণে বিভক্ত করে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা করা হয়। একই দিনে ৪৯টি থানা ও ১০৩টি ওয়ার্ড কমিটির সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা করা হয়।

এর মধ্যে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখায় দুটি পক্ষ। একটি পক্ষ মোহাম্মদ হানিফের ছেলে ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকনকে ঘিরে, অপরটি কমিটির সাধারণ সম্পাদক শাহে আলমকে ঘিরে তৈরি হয়। গত বছরের অক্টোবরে মগবাজার উড়ালসড়ক উদ্বোধন অনুষ্ঠানে হাতাহাতিতে জড়ান দুই পক্ষের নেতারা। ১ নভেম্বর দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক বর্ধিত সভায় দুই পক্ষ আবারও মুখোমুখি হয়। ১৬ নভেম্বর দুই পক্ষের সংঘাতে আজিমপুর এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পার্ল হারবার কমিউনিটি সেন্টারের সামনে ময়লার স্তূপ ফেলে দলের যৌথ সভা পণ্ড করে দেওয়া হয়।

আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, দুই পক্ষের দ্বন্দ্বের মূলে রয়েছে নগরের ফুটপাত, চাঁদাবাজি, উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের দরপত্র নিয়ন্ত্রণসহ আধিপত্য বিস্তার। কেন্দ্রীয় নেতারাও দুই পক্ষে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন।

গত ২৭ ডিসেম্বর ঢাকা মহানগর উত্তরের থানা ও ওয়ার্ডের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করেন মহানগর সভাপতি এ কে এম রহমত উল্লাহ ও সাধারণ সম্পাদক সাদেক খান। এক দল ওয়ার্ড নেতা গণভবনে গিয়ে অভিযোগ দিলে কমিটি স্থগিত করেন দলীয় প্রধান। এর আগেও একবার কমিটি ঘোষণার উদ্যোগ নেয় মহানগর নেতৃত্ব। সেবারও গণভবনে গিয়ে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার কাছে অভিযোগ দেওয়ার পর তা আটকে যায়। এ অবস্থায় উত্তরেও মুখোমুখি অবস্থা বিরাজ করছে।

আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, নির্বাচনের আগে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের জন্য কাউকে দল থেকে বের করে দেওয়া বা বড় সাংগঠনিক ব্যবস্থা না নেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত আছে। স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে যাঁরা দলের বিদ্রোহী হয়ে প্রার্থী হয়েছিলেন, তাঁদেরও সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয়েছে গত বছর। এখন সংঘাতে প্রাণহানি কিংবা অন্য কোনো বড় ঘটনা না ঘটলে কারও বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। তবে নেতাদের অনেকে মনে করছেন, এই ব্যবস্থা দিয়ে অভ্যন্তরীণ ‘ফাটল’ জোড়া লাগানো যাবে না।

Leave a Reply

৯৭/৩/খ, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬
মোবাইলঃ ০১৭১২-৬৪৩৬৭৩, বার্তা বিভাগঃ ০১৭১২-৬৪৪৩৫০, সার্কুলেশন বিভাগঃ০১৯১৬০৯৯০২০
ইমেইলঃ [email protected], [email protected]

সম্পাদক:
মোঃ সুলতান চিশতী

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ
মহসিন হাসান খান (বুলবুল)

নির্বাহী সম্পাদকঃ
মোঃ ইব্রাহিম হোসেন

সহকারী সম্পাদকঃ
মোঃ আতোয়ার হোসেন

আইন উপদেষ্টাঃ
শাহিন সরকার


.: Developed By :.
Great IT