২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ৯ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, শরৎকাল

‘খেয়াল রাখবে, কেউ যেন আন্দোলন বানচাল করতে না আসে’

প্রকাশিতঃ আগস্ট ৩, ২০১৮, ৮:০৪ অপরাহ্ণ


‘আমার সন্তানদের বলতে চাই, তোমরা একটি গাড়িও ভাঙচুর করবে না। কারণ এই ভাঙচুরের কারণে সুযোগ সন্ধানীরা ১০টি বা ২০টি গাড়ি ভাঙচুর করবে। বাবারা-মায়েরা, তোমরা খেয়াল রাখবে, তোমাদের আন্দোলন কেউ যেন বানচাল করতে না আসে। তোমাদের মধ্যে যেন কোনো অপশক্তি ঢুকে না যায়, এটা লক্ষ রাখতে হবে।’ বললেন ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের চেয়ারম্যান ও চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে আজ শুক্রবার সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধনে তিনি এসব কথা বলেন।

মানববন্ধনে সরকারকে আগামী রোববার থেকে ‘নিরাপদ সড়ক’-সংক্রান্ত ৯ দফা দাবি বাস্তবায়নের শর্ত দিয়ে শিক্ষার্থীদের ঘরে ফেরার আহ্বানও জানিয়েছেন ইলিয়াস কাঞ্চন। ২৫ বছর ধরে নিরাপদ সড়কের দাবিতে সারা দেশে সচেতনতা তৈরির কাজ করছেন ইলিয়াস কাঞ্চন। এই আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা তাঁর সবচেয়ে বড় সহযোগী হয়েছেন। নিরাপদ সড়কের দাবি সবার প্রাণের দাবিতে পরিণত হয়েছে।

ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘২৫ বছর ধরে এক রক্তক্ষরণ বুকে নিয়ে চলছি। আমি চেয়েছি আমার সন্তানের মতো কেউ যেন আর মা-হারা না হয়। বাংলাদেশের কোনো মানুষ যেন আমার সন্তানের মায়ের মতো সড়কে নিষ্পেষিত না হয়। বাংলাদেশের সড়কে যেন রক্ত না ঝরে। এই আন্দোলন করতে গিয়ে ২৫ বছর ধরে কত রকমের নির্যাতন ও কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। এখন তো কোমলমতি ছাত্রছাত্রীরা পর্যন্ত রাস্তায় নেমে এসেছে। প্রতিদিন জীবন দেওয়ার চেয়ে সাময়িক অসুবিধা হলেও দাবি আদায়ের আন্দোলনে সবাই রাস্তায় নেমে এসেছে। শুরু থেকে এদের প্রতি সংহতি জানিয়ে এসেছি।’

কয়েক দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ বলেছেন, নিরাপদ সড়কে আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমেছে, সরাসরি তাদের পাশে না থাকায় অনেকে বলেছেন ইলিয়াস কাঞ্চন কোথায়?

ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘আমি যা করি, আমার বিবেক বুদ্ধি বিবেচনা দিয়েই করি। পেছনের দিকে তাকিয়ে দেখি, এ দেশে কী হয়, কী হয়েছিল এবং কীভাবে অন্য আন্দোলনগুলো থামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এসব আন্দোলনের নাম আমি বলতে চাই না। আমি যদি পাশে থাকতাম, তাহলে এই দোষ আমার গায়ে চাপিয়ে দেওয়া হতো এবং আন্দোলনকে বানচাল করা হতো। ইলিয়াস কাঞ্চন ২৫ বছর ধরে যে আন্দোলন করছে, তারা সেই আন্দোলনে আজ সবাই রাস্তায় নেমেছে। বুঝলাম, সন্তানেরা আমাকে ভুলে যায়নি, নিরাপদ সড়কের দাবিতে তারা রাস্তায় নেমেছে।’

৫ আগস্ট মেয়ের কাছে যাওয়ার কথা ছিল ইলিয়াস কাঞ্চনের। তাঁর মেয়ে ইমা সন্তানসম্ভবা। বাবা ইলিয়াস কাঞ্চনের কাছে মেয়ে আবদার করে বলেছিলেন, ‘আজ যদি আমার মা বেঁচে থাকতেন, তাহলে তিনি আমার পাশে থাকতেন।’ মেয়ের এমন কথায় যুক্তরাজ্যে যাওয়ার সব ব্যবস্থা করেন তিনি। নিজের মেয়ের কথা শুনে কান্না পেলেও দেশের হাজারো মায়ের সন্তানদের কথা ভেবে ইলিয়াস কাঞ্চন তাঁর যুক্তরাজ্যযাত্রা বাতিল করেন।

ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘লন্ডনে আমার একটা সন্তান, আর এ দেশে নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তায় আন্দোলনে করছে হাজার হাজার সন্তান। এই কোমলমতি সন্তানদের রাস্তায় রেখে আমি কী করে লন্ডনে মেয়ের কাছে যাই? পুরো বাংলাদেশ এখন নিরাপদ সড়কের দাবিতে চিৎকার করছে। থাক না আমার এক মেয়ে ওখানে। আমি আছি সমগ্র বাংলাদেশের সন্তানদের নিয়ে। স্বজন হারানোর বেদনা কতটা হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটায়, তা তো আমি জানি। আপাতত তাই লন্ডন যাওয়া বাতিল। তা ছাড়া অনিয়মকে নিয়মের শৃঙ্খলে বাঁধতে যেসব ত্রুটি-বিচ্যুতি আছে, তা চিহ্নিত করার দায়িত্ব এসেছে আমার কাঁধে। গঠিত তদন্ত কমিটির দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে চাই।’

আন্দোলন করা শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘আমার সন্তানদের বলতে চাই, তোমরা একটি গাড়িও ভাঙচুর করবে না। কারণ এই ভাঙচুরের কারণে সুযোগ সন্ধানীরা ১০টি বা ২০টি গাড়ি ভাঙচুর করবে। বাবারা-মায়েরা, তোমরা খেয়াল রাখবে, তোমাদের আন্দোলন কেউ যেন বানচাল করতে না আসে। তোমাদের মধ্যে যেন কোনো অপশক্তি ঢুকে না যায়, এটা লক্ষ রাখতে হবে। সুশৃঙ্খল, সুনিয়ন্ত্রিতভাবে এই কাজটি করে যাও। আমি আছি তোমাদের পাশে এবং থাকব। এ দেশের মানুষের জন্য যত দিন সড়ক নিরাপদ না হবে, শেষ রক্তবিন্দু যত দিন থাকবে, শেষনিশ্বাস যত দিন থাকবে, এ সংগ্রাম চালিয়ে যাব।’

ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘সব অধিদপ্তর যদি তাদের কর্মকাণ্ড শুরু করে দেয়, তাহলে আমার সন্তানদের উদ্দেশে বলব, তোমরা অবশ্যই ঘরে ফিরে যাবে, লেখাপড়া করবে। বাবা-মায়ের কাছে থাকবে। প্রয়োজনে আবারও যদি কোনো অসুবিধা হয়, তখন অবশ্যই আমরা তোমাদের সঙ্গে থেকে আবার রাজপথে নামব।’

অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘জনগণের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, আপনার আপনাদের সন্তানদের পাশে থাকুন। আপনারা অস্থির হয়ে যাবেন না। ভালো কিছু পাওয়ার জন্য অনেক সময় কষ্ট স্বীকার করতে হয়। আপনারা খেয়াল করবেন যেনও কোনো সুযোগ সন্ধানী এই আন্দোলনকে বানচাল করতে না পারে।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে প্রশ্ন রেখে ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী একদিকে আমাদের সন্তানদের ঘরে যেতে বলছেন, অন্যদিকে পরিবহনশ্রমিকেরা ধর্মঘট করছেন। তাহলে কোনটা চলবে?’

উল্লেখ্য, গত ২৯ জুলাই দুপুরে রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের অদূরে বিমানবন্দর সড়কে (র‍্যাডিসন হোটেলের উল্টোদিকে) বাসচাপায় শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী দিয়া খানম মীম ও আবদুল করিম নিহত হয়। ওই দিন দুপুর সাড়ে ১২টায় বিমানবন্দর সড়কের বাঁ পাশে বাসের জন্য অপেক্ষা করার সময় জাবালে নূর পরিবহনের একটি বাস তাদের চাপা দিলে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এ সময় বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে কলেজের শিক্ষার্থীরা। তারা জাবালে নূর পরিবহনের ওই বাসে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট চালকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, নিরাপদ সড়ক নিশ্চিতকরণ ও নৌপরিবহনমন্ত্রীর অনৈতিক বক্তব্যের প্রতিবাদসহ ৯ দফা দাবি জানায় শিক্ষার্থীরা। পাঁচ দিন ধরে শিক্ষার্থীরা রাজধানীতে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করছে তারা।

Leave a Reply

৯৭/৩/খ, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬
মোবাইলঃ ০১৭১২-৬৪৩৬৭৩, বার্তা বিভাগঃ ০১৭১২-৬৪৪৩৫০
ইমেইলঃ [email protected], [email protected]

সম্পাদক:
মোঃ সুলতান চিশতী

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ
মহসিন হাসান খান (বুলবুল)

নির্বাহী সম্পাদকঃ
মোঃ ইব্রাহিম হোসেন

সহকারী সম্পাদকঃ
মোঃ আতোয়ার হোসেন

আইন উপদেষ্টাঃ
শাহিন সরকার


.: Developed By :.
Great IT