১৯শে নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, হেমন্তকাল

কোরআন-হাদিসে সন্ত্রাস প্রসঙ্গ

প্রকাশিতঃ জানুয়ারি ২৭, ২০১৮, ১২:১৫ পূর্বাহ্ণ


একবিংশ শতাব্দীর জ্ঞান-বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষতার সঙ্গে প্রতিযোগিতা দিয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে সন্ত্রাস। সন্ত্রাস একদিকে যেমন বিশ্ব শান্তিকে হুমকির মুখে দাঁড় করে দিয়েছে, অন্যদিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে সভ্যতার সৌধকে। বর্তমান বিশ্বে ইসলামকে সন্ত্রাসের সঙ্গে একাকার করে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। অথচ মানব সভ্যতার শুরুতেই সন্ত্রাস প্রতিরোধ ও শান্তি প্রতিষ্ঠার মহান ব্রত নিয়ে ইসলাম পৃথিবীতে এসেছে। প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা সন্ত্রাসের সঙ্গে ইসলামি অনুশাসন প্রতিষ্ঠার কাজকে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে। এর দ্বারা ইসলামপ্রিয় জনগোষ্ঠীকে আতঙ্কিত করে তোলা হচ্ছে এবং বিশ্বে ইসলাম সম্পর্কে ভুল ধারণার সৃষ্টি করা হচ্ছে। এ প্রবন্ধে কোরআন ও হাদিসে সন্ত্রাস প্রসঙ্গ কার্যক্রম বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।

ইসলামি আইনের প্রধান উৎস আল কোরআনুল কারিমে সন্ত্রাস প্রসঙ্গ দু-ভাবে এসেছেÑ শাব্দিক অর্থে ও পারিভাষিক অর্থে। সন্ত্রাসের আরবি প্রতিশব্দ ‘ইরহাব’কে ভিত্তি ধরে শাব্দিক অর্থ হলোÑ প্রথমত, আল্লাহকে ভয় করা অর্থে এর শব্দমূলের ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। যেমনÑ আল্লাহ বলেন, ‘মুসার ক্রোধ যখন প্রশমিত হলো তখন সেগুলো তুলে নিল। যারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে তাদের জন্য তাতে যা লিখিত ছিল তার মধ্যে ছিল পথনির্দেশ ও রহমত।’ অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘হে বনি ইসরাইল! আমার সেই অনুগ্রহকে তোমরা স্মরণ করো, যা দ্বারা আমি তোমাদের অনুগৃহীত করেছি এবং আমার সঙ্গে তোমাদের অঙ্গীকার পূর্ণ করব। আর তোমরা শুধু আমাকেই ভয় করো।’ অপর এক আয়াতে উল্লেখ আছে, ‘আল্লাহ বললেন, তোমরা দুই ইলাহ গ্রহণ করো না; তিনিই তো একমাত্র ইলাহ। সুতরাং আমাকেই ভয় করো।’
দ্বিতীয়ত, মানুষকে ভয় দেখানো বা সন্ত্রস্ত করা অর্থেও ইরহাব শব্দের সরাসরি ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা তাদের মোকাবিলার জন্য যথাসাধ্য শক্তি ও অশ্ববাহিনী প্রস্তুত রাখবে, এর দ্বারা তোমরা সন্ত্রস্ত করবে আল্লাহর শত্রুকে, তোমাদের শত্রুকে এবং অন্যদের যাদের তোমরা জান না, আল্লাহ তাদের জানেন। আল্লাহর পথে তোমরা যা কিছু ব্যয় করবে তার পূর্ণ প্রতিদান তোমাদের দেওয়া হবে এবং তোমাদের প্রতি জুলুম করা হবে না।’ সামান্য পরিবর্তিত ফর্মে শব্দটি ব্যবহার করে আল্লাহ অন্যত্র বলেন, ‘সে (মুসা) বলল, তোমরাই নিক্ষেপ করো। যখন তারা (জাদুকররা রজ্জু ও লাঠি) নিক্ষেপ করল তখন তারা লোকের চোখে জাদু করল, তাদের আতঙ্কিত করল এবং তারা বড় রকমের জাদু দেখাল।’
প্রচলিত অর্থে সন্ত্রাস বলতে যা বোঝায় তা প্রকাশের জন্য ইরহাব শব্দের ব্যবহার কোরআনে পাওয়া যায় না। সন্ত্রাস বা সন্ত্রাসী কার্যক্রম বোঝানোর জন্য কোরআনে ‘ফেতনা’ এবং ‘ফ্যাসাদ’ শব্দদ্বয়ের ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। এ প্রসঙ্গে পাকিস্তান থেকে প্রকাশিত সিরাতবিষয়ক উর্দু বিশ্বকোষ ‘নুকুশ’ এর বর্ণনা নিম্নরূপ। ‘পবিত্র কোরআন গভীরভাবে অধ্যয়ন ও গবেষণা করলে এ কথা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, মানুষের জান-মাল, ইজ্জত-আব্রু, ঈমান, কায়-কারবার ইত্যাদি যার কারণে হুমকি ও বিপর্যয়ের মুখে পতিত হয় তা-ই হলো ‘ফেতনা’ এবং যার কারণে মানুষের জীবনের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়, তা-ই হলো ‘ফ্যাসাদ’।’
আল কোরআনে ‘ফেতনা’ শব্দটি একাধিক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যেসব আয়াতে ‘ফেতনা’কে সন্ত্রাস কাছাকাছি অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে তার কয়েকটি উদাহরণ নিম্নে প্রদত্ত হলোÑ আল্লাহকে অস্বীকার করা, তাঁর অংশীদার সাব্যস্ত করা, ইবাদতে বাধা প্রদান ও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা ফেতনার অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ বলেন, ‘পবিত্র মাসে যুদ্ধ করা সম্পর্কে লোকে তোমাকে যদি জিজ্ঞেস করে। বল, তাতে যুদ্ধ করা ভীষণ অন্যায়। কিন্তু আল্লাহর পথে বাধা দান করা, আল্লাহকে অস্বীকার করা, মসজিদুল হারামে প্রবেশে বাধা দেওয়া এবং তার বাসিন্দাকে তা থেকে বহিষ্কার করা আল্লাহর কাছে তদপেক্ষা অধিক অন্যায়; ফেতনা (দাঙ্গা, বিশৃঙ্খলা, নির্যাতন) হত্যা অপেক্ষা গুরুতর অন্যায়।’
দুর্বলের ওপর অত্যাচার করা, তাদের ন্যায্য অধিকার হরণ করা, তাদের ঘরবাড়ি জবরদখল করা এবং তাদের বিভিন্ন পন্থায় কষ্ট দেওয়াও ফেতনার আওতাভুক্ত। আল্লাহ বলেন, ‘যারা নির্যাতিত হওয়ার পর হিজরত করে, অতঃপর জিহাদ করে এবং ধৈর্য ধারণ করে, তোমার প্রতিপালক এসবের পর, তাদের প্রতি অবশ্যই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ জবরদস্তিমূলক সত্যকে দমন করা এবং সত্যগ্রহণ থেকে মানুষকে বাধা দেওয়া অর্থে। আল্লাহ বলেন, ‘ফেরাউন ও তার পারিষদবর্গ নির্যাতন করবে এ আশঙ্কায় মুসার সম্প্রদায়ের এক দল ব্যতীত আর কেউ তার প্রতি ঈমান আনেনি। বস্তুত ফেরাউন ছিল দেশে পরাক্রমশালী এবং সে অবশ্যই সীমা লঙ্ঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত।’ মানুষকে বিভ্রান্ত করা, বিপথে চালিত করা এবং সত্যের বিরুদ্ধে প্রতারণা, ধোঁকা, বিশ্বাসঘাতকতা ও বল প্রয়োগের চেষ্টা করা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘আমি তোমার প্রতি যা প্রত্যাদেশ করেছি তা থেকে তারা পদস্খলন ঘটানোর চেষ্টায় প্রায় চূড়ান্ত করেছিল যাতে তুমি আমার সম্বন্ধে তার বিপরীত মিথ্যা উদ্ভাবন করো; তবেই তারা অবশ্যই তোমাকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করত।’ বিশ্বাসীদের বিপদে ফেলাও সন্ত্রাসের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ বলেন, ‘যারা বিশ্বাসী নর-নারীদের বিপদাপন্ন করেছে এবং পরে তাওবা করেনি তাদের জন্য আছে জাহান্নামের শাস্তি, আছে দহন যন্ত্রণা।’ অসত্যের প্রতিষ্ঠা, অসৎ ও অবৈধ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য যুদ্ধ, হত্যা ও রক্তপাত করা অর্থে। আল্লাহ বলেন, ‘যদি বিভিন্ন দিক থেকে তাদের বিরুদ্ধে শত্রুদের প্রবেশ ঘটত, অতঃপর তাদের বিদ্রোহের জন্য প্ররোচিত করা হতো, তবে তারা অবশ্য তাই করত, তারা এতে কালবিলম্ব করত না।’
আল কোরআনুল কারিমে ‘ফ্যাসাদ’ শব্দটি বিভিন্ন আয়াতে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যেসব আয়াতে ‘ফ্যাসাদ’ শব্দকে সন্ত্রাসের কাছাকাছি অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে তার

কয়েকটি উদাহরণ নিম্নে প্রদত্ত হলো। অন্যায় শাসন ও হত্যাকা-, দুর্বলদের প্রতি অবিচার ও সম্পদ লুটপাট করা। আল কোরআনে আল্লাহ ফেরাউনকে ‘ফ্যাসাদ’ সৃষ্টিকারী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, কারণ সে তার প্রজাদের মাঝে শ্রেণি ও বর্ণগত পার্থক্য সৃষ্টি করত এবং স্বৈরাচারী শাসন চালাত, দুর্বলদের ও বিরোধীদের অন্যায়ভাবে হত্যা করত এবং তাদের সম্পদ লুট করত। আল্লাহ বলেন, ‘ফেরাউন দেশে পরাক্রমশালী হয়েছিল এবং সেখানের অধিবাসীদের বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত করে তাদের একটি শ্রেণিকে সে হীনবল করেছিল; তাদের পুত্রদের সে হত্যা করত এবং নারীদের জীবিত থাকতে দিত। সে তো ছিল বিপর্যয় সৃষ্টিকারী।’ ন্যায়ানুগ পন্থার বিপরীতে বিকৃত পথে জীবন চালানো। প্রাচীনকালের আদ, সামুদ, লুত, মাদায়েনবাসীসহ বিভিন্ন জাতিকে আল কোরআনে আল্লাহ ফ্যাসাদকারী হিসেবে গণ্য করেছেন। কারণ তারা সত্য ও ন্যায়নিষ্ঠভাবে জীবনযাপনের পরিবর্তে বিকৃত পথে জীবনকে চালিত করেছিল।
আল্লাহ বলেন, ‘যারা দেশে সীমা লঙ্ঘন করেছিল এবং সেখানে অশান্তি বৃদ্ধি করেছিল।’ অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরাই তো পুরুষ উপগত হচ্ছ, তোমরাই তো রাহাজানি করে থাক এবং তোমরাই তো নিজেদের মজলিসে প্রকাশ্যে ঘৃণ্য কাজ করে থাক। উত্তরে তার সম্প্রদায় শুধু এই বলল, আমাদের ওপর আল্লাহর শাস্তি আনয়ন করোÑ যদি তোমরা সত্যবাদী হও।’
আগ্রাসনের ফলে সৃষ্ট বিপর্যয়
সাম্রাজ্যবাদীদের আগ্রাসনের ফলে যে বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয় তা-ও ফ্যাসাদ। আল্লাহ বলেন, ‘সে বলল, রাজা-বাদশাহরা যখন কোনো জনপদে প্রবেশ করে তখন তাকে বিপর্যস্ত করে দেয় এবং সেখানকার মর্যাদাবান ব্যক্তিদের অপদস্থ করে, এরাও এরূপই করবে।’ অন্য স্থানে আল্লাহ বলেন, ‘আর সেই শহরে ছিল এমন ৯ ব্যক্তি, যারা দেশে বিপর্যয় সৃষ্টি করত এবং সৎকর্ম করত না।’
জুলুম, অবিচার ও লুটতরাজের কাজে প্রশাসনিক ক্ষমতার ব্যবহার করা। যে ধরনের শাসন ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় প্রশাসনিক ক্ষমতাকে মহৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহারের পরিবর্তে জুলুম, অবিচার ও লুটতরাজের কাজে ব্যবহার করা হয় তাকে আল কোরআন ‘ফ্যাসাদ’ নামে অভিহিত করেছে। আল্লাহ বলেন, ‘যখন সে প্রস্থান করে তখন সে পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টির এবং শস্যক্ষেত্র ও জীবজন্তু নিপাতের চেষ্টা করে। আর আল্লাহ অশান্তি পছন্দ করেন না।’ সন্ত্রাসের মাধ্যমে যারা সমাজে অশান্তি সৃষ্টির অপচেষ্টা চালায় আল কোরআন তাদের ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

Leave a Reply

৯৭/৩/খ, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬
মোবাইলঃ ০১৭১২-৬৪৩৬৭৩, বার্তা বিভাগঃ ০১৭১২-৬৪৪৩৫০, সার্কুলেশন বিভাগঃ০১৯১৬০৯৯০২০
ইমেইলঃ [email protected], [email protected]

সম্পাদক:
মোঃ সুলতান চিশতী

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ
মহসিন হাসান খান (বুলবুল)

নির্বাহী সম্পাদকঃ
মোঃ ইব্রাহিম হোসেন

সহকারী সম্পাদকঃ
মোঃ আতোয়ার হোসেন

আইন উপদেষ্টাঃ
শাহিন সরকার


.: Developed By :.
Great IT