২০শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ৫ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, শরৎকাল

কেমন হবে ই-পাসপোর্ট, মিলবে ডিসেম্বরে

প্রকাশিতঃ মে ৩০, ২০১৮, ১১:৩৪ পূর্বাহ্ণ


যন্ত্রে অপাঠযোগ্য কাগুজে পাসপোর্টের দিন শেষ হয়েছে বেশ আগেই। যন্ত্রে পাঠযোগ্য পাসপোর্টের (মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট-এমআরপি) ধারণাও শেষ প্রায়। কারণ, যুগ এখন ইলেকট্রনিক বা ই-পাসপোর্টের। এর মধ্যে বিশ্বের ১১৯টি দেশে চালু হয়ে গেছে এই পাসপোর্ট। পিছিয়ে নেই বাংলাদেশও। আগামী ডিসেম্বর থেকে চালু হতে পারে ই-পাসপোর্ট।

সরকারের বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ই-পাসপোর্ট সংক্রান্ত প্রকল্প প্রস্তাব আগামী ৫ জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির বৈঠকে উপস্থাপন করার কথা। এর আগে ১৫ মে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে প্রকল্পটি অনুমোদন করা হয়। এই প্রকল্পে সরকারিভাবে বাংলাদেশকে কারিগরি সহায়তা দেবে জার্মানি। জানা যায়, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার ই-পাসপোর্ট চালুর বিষয়টিকে নিজেদের রাজনৈতিক সাফল্য-ব্যর্থতার অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে। সে জন্য তারা সংসদ নির্বাচনের আগেই ই-পাসপোর্ট চালু করতে চায়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল প্রথম আলোকে বলেন, ই-পাসপোর্ট প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য জার্মানির একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আগামী জুন-জুলাইয়ের মধ্যে চুক্তি সম্পাদন করা হবে। আশা করা যায়, ডিসেম্বরের মধ্যে ই-পাসপোর্ট চালু করা সম্ভব হবে। তবে সেটা পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যাবে জার্মানির প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হওয়ার পর। কারণ, কাজটা তারাই করবে। তারা যদি বলে ডিসেম্বরের মধ্যে চালু করা সম্ভব হবে না, সে ক্ষেত্রে সময় এক-দু মাস বেশি লেগে যেতে পারে।

কেমন হবে ই-পাসপোর্ট
পাসপোর্ট অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ই-পাসপোর্টে ৩৮ ধরনের নিরাপত্তা ফিচার থাকবে। বর্তমানে এমআরপি ডেটাবেইসে যেসব তথ্য আছে, তা ই-পাসপোর্টে স্থানান্তর করা হবে। পাসপোর্টের মেয়াদ হবে বয়সভেদে ৫ ও ১০ বছর। ই-পাসপোর্ট চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এমআরপি পাসপোর্ট বাতিল হয়ে যাবে না। তবে কারও পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে তাঁকে এমআরপির বদলে ই-পাসপোর্ট নিতে হবে।

বর্তমানে বই আকারে যে পাসপোর্ট আছে, ই-পাসপোর্টেও একই ধরনের বই থাকবে। তবে বর্তমানে পাসপোর্টের বইয়ের শুরুতে ব্যক্তির তথ্যসংবলিত যে দুটি পাতা আছে, ই-পাসপোর্টে তা থাকবে না। সেখানে থাকবে পালিমারের তৈরি একটি কার্ড। এই কার্ডের মধ্যে থাকবে একটি চিপ। সেই চিপে পাসপোর্টের বাহকের তথ্য সংরক্ষিত থাকবে।

ই-পাসপোর্টের সব তথ্য কেন্দ্রীয়ভাবে সংরক্ষিত থাকবে ‘পাবলিক কি ডাইরেকটরি’তে (পিকেডি)। আন্তর্জাতিক এই তথ্যভান্ডার পরিচালনা করে ইন্টারন্যাশনাল সিভিল অ্যাভিয়েশন অর্গানাইজেশন (আইসিএও)। ইন্টারপোলসহ বিশ্বের সব বিমান ও স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ এই তথ্যভান্ডারে ঢুকে তথ্য যাচাই করতে পারে।

ই-পাসপোর্টের বাহক কোনো দেশের দূতাবাসে ভিসার জন্য আবেদন করলে কর্তৃপক্ষ স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে আবেদনকারীর তথ্যের সঙ্গে পিকেডিতে সংরক্ষিত তথ্য যাচাই করে নেবে এবং আবেদন গ্রহণ করে বইয়ের পাতায় ভিসা স্টিকার কিংবা বাতিল করে সিল দেবে। স্থল ও বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষও একই পদ্ধতিতে পিকেডিতে ঢুকে ই-পাসপোর্টের তথ্য যাচাই করবে।

পাসপোর্ট অধিদপ্তর থেকে জানা যায়, ই-পাসপোর্ট চালুর জন্য দেশের প্রতিটি বিমান ও স্থলবন্দরে চাহিদামোতাবেক ই-গেট স্থাপন করে স্বয়ংক্রিয় সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি চালু করা হবে। যাঁদের হাতে ই-পাসপোর্ট থাকবে, তাঁদের এই গেট দিয়ে সীমান্ত পার হতে হবে। তবে যাঁদের হাতে এমআরপি পাসপোর্ট থাকবে, তাঁদের ইমিগ্রেশনের কাজ বিদ্যমান পদ্ধতিতে চলমান থাকবে।
ব্যয় ৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা
বিভিন্ন দেশের বিমানবন্দর ও অন্যান্য সীমান্ত বন্দরে এই ব্যবস্থা এর মধ্যে চালু রয়েছে। বিশ্বের ১১৯টি দেশে ই-পাসপোর্ট চালু হয়েছে। এটি মেশিন রিডেবল পাসপোর্টের চেয়ে বেশি নিরাপদ।

পাসপোর্ট অধিদপ্তর সূত্র জানায়, শুরুতে ২০ লাখ পাসপোর্ট জার্মানি থেকে প্রিন্ট করিয়ে সরবরাহ করা হবে। এরপর আরও ২ কোটি ৮০ লাখ পাসপোর্ট বাংলাদেশে প্রিন্ট করা হবে। সে জন্য উত্তরায় কারখানা স্থাপন করা হবে। পরবর্তী সময়ে ওই কারখানায় থেকে ই–পাসপোর্ট ছাপানো অব্যাহত রাখা হবে।

এই প্রকল্পের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। পুরো টাকাই বাংলাদেশ সরকার বহন করবে। বর্তমানের বই আকারের পাসপোর্টে সরকারের যে টাকা ব্যয় হয়, সেই অনুপাতে ই-পাসপোর্ট চালু হলে পাসপোর্টপ্রতি সরকারের প্রায় ৩ ডলার করে সাশ্রয় হবে বলে কর্মকর্তারা ধারণা করছেন।

প্রেক্ষাপট
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৬ সালের ২৪ এপ্রিল পাসপোর্টসেবা সপ্তাহ উদ্বোধনের সময়ে ই-পাসপোর্ট চালুর বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছিলেন। এরই অংশ হিসেবে সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় (২০১৬-২০) আধুনিক ইমিগ্রেশন–ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য ই-পাসপোর্ট প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এরপর শেখ হাসিনার জার্মানি সফরের সময় ২০১৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে ই-পাসপোর্ট চালুর বিষয়ে জার্মানির সরকারি প্রতিষ্ঠান ভেরিডোস জেএমবিএইচের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই হয়।

জানা যায়, প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিবের সভাপতিত্বে গত ২ ফেব্রুয়ারি থেকে ৮ এপ্রিল পর্যন্ত কারিগরি কমিটির মোট ছয়টি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এসব সভার তিনটিতে বাংলাদেশে জার্মানির রাষ্ট্রদূত ও উপরাষ্ট্রদূত উপস্থিত ছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৩ ফেব্রুয়ারি পরিকল্পনা বিভাগ থেকে ই-পাসপোর্ট সংক্রান্ত প্রকল্প প্রস্তাব দ্রুত একনেক সভায় উত্থাপনের অনুরোধ জানিয়ে তাগিদ দেওয়া হয়।

পাসপোর্টের বিবর্তন
মধ্যযুগে বিদেশি পর্যটক বা পরিব্রাজকেরা ইউরোপের দেশগুলোর কোনো শহর বা নগরে প্রবেশ করতে চাইলে নগর কর্তৃপক্ষ তাঁদের শনাক্ত করার জন্য গেটপাস দিত। আর পাসপোর্টের প্রথম ধারণা পাওয়া যায় ব্রিটেনের রাজা পঞ্চম হেনরির সময়ে। তাঁর সময়ে ১৫৪০ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে আইন হয় এবং ট্রাভেল ডকুমেন্ট হিসেবে পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়। এরপর ১৭৯৪ সালে তারা সরকারি চাকুরেদের জন্য পাসপোর্ট ইস্যু করে।

পাসপোর্টের ইতিহাস থেকে জানা যায়, জাপানে নাগরিকদের জন্য প্রথম পাসপোর্ট ইস্যু করা হয় ১৮৬৬ সালে। এরপর ১৮৯৮ সালে চীনে এবং ১৯০০ সালে অটোমান সাম্রাজ্যে পাসপোর্টের প্রচলন শুরু হয়।

তবে আন্তর্জাতিকভাবে আধুনিক পাসপোর্টের ধারণা শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯২০ সালে। মূলত, দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে এর ওপর জোর দেয়। তখন প্যারিসে অনুষ্ঠিত সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের (লিগ অব ন্যাশনস) বৈঠকে এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাতায়াতের ক্ষেত্রে কাগজের তৈরি পাসপোর্ট এবং আনুষঙ্গিক অন্য নিয়মকানুন চালু করে। ১৯৮০ সালের পর আসে এমআরপির ধারণা। যদিও বাংলাদেশের এর যাত্রা শুরু হয়েছে অনেক পরে, ২০১০ সালে। তার আগেই ২০০৮ সাল থেকে উন্নত দেশগুলোতে ই-পাসপোর্ট চালু করে।

Leave a Reply

৯৭/৩/খ, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬
মোবাইলঃ ০১৭১২-৬৪৩৬৭৩, বার্তা বিভাগঃ ০১৭১২-৬৪৪৩৫০
ইমেইলঃ [email protected], [email protected]

সম্পাদক:
মোঃ সুলতান চিশতী

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ
মহসিন হাসান খান (বুলবুল)

নির্বাহী সম্পাদকঃ
মোঃ ইব্রাহিম হোসেন

সহকারী সম্পাদকঃ
মোঃ আতোয়ার হোসেন

আইন উপদেষ্টাঃ
শাহিন সরকার


.: Developed By :.
Great IT