১৩ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ২৯শে কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, হেমন্তকাল

কঠোরতম অভিযানেও থামেনি ইয়াবার চালান

প্রকাশিতঃ সেপ্টেম্বর ৬, ২০১৮, ১১:১২ পূর্বাহ্ণ


সারাদেশে মরণনেশা ইয়াবাসহ মাদকবিরোধী বিরোধী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোরতম অভিযানেও থামেনি ইয়াবা আসার সে াত। শনিবার রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে ৪০ হাজার পিস ইয়াবা জব্দ করে র‌্যাব। মঙ্গলবার রাতে ফেনীতে র‌্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে ২ মাদক কারবারি নিহত হন। এপ্রিল-মে মাসে শুরু হওয়া মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযানে এ যাবত আড়াই শতাধিক মাদক কারবারি ‘বন্ধুকযুদ্ধে’ নিহত হওয়ার পরও এখনো দেশজুড়ে হাত বাড়ালেই মিলছে ইয়াবা।

‘চল যাই যুদ্ধে, মাদকের বিরুদ্ধে’ এমন স্লোগান নিয়ে শুরু হওয়া অভিযানের পর গত ৩ মাসেও শুধু পুলিশ ও র‌্যাব উদ্ধার করেছে কোটি পিসেরও বেশি নিষিদ্ধ ইয়াবা ট্যাবলেট। মাদকের গডফাদাররা ধরাছোঁয়ার বাইরে, চুনোপুঁটি নিহত হওয়া এবং সীমান্ত ‘অরক্ষিত’ থাকায় এখনো দেশ ইয়াবায় ভাসছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট অনেকে।

কক্সবাজারের স্থানীয় সূত্র বলছে, মাদকবিরোধী কঠোর অভিযানের মধ্যেও নাফ নদী ও সাগরপথে বাংলাদেশে ঢুকছে ইয়াবার চালান। আত্মগোপনে যাওয়া টেকনাফের শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ীরাও ফিরতে শুরু করেছেন। ফিরেই আবার ইয়াবা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে নিতে শুরু করেছেন তারা। প্রশাসনের একশ্রেণির অসাধু ব্যক্তিকে ম্যানেজ করেই এসেছে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, ইয়াবার প্রধান উৎস মিয়ানমার। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের দুই পারের পাচারকারী সিন্ডিকেটগুলো বহাল তবিয়তে আছে। ভারতের কিছু অংশ ও থাইল্যান্ড থেকে ইয়াবা আসছে। এই প্রতিবেশী দেশ থেকে নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আসে ইয়াবা। মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) বেশিরভাগ সদস্য সরাসরি জড়িত ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে। তাদের সহযোগিতা করে আসছে দু’দেশের পাচারকারী সিন্ডিকেটগুলো।

মঙ্গলবার এক অনুষ্ঠানে চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনার মাহাবুবুর রহমান দাবি করেছেন, সীমান্তে কঠোর নজরদারি না থাকার কারণেই দেশে ইয়াবাসহ মাদক প্রবেশ করছে। সীমান্তে ও জলপথে বিজিবি ও কোস্টগার্ড কঠোর অবস্থান নিলে দেশে এত মাদক ঢুকতে পারত না। একইসঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মাদক কারবারিদের নিহত হওয়ার যৌক্তিকতা তুলে ধরার চেষ্টা করেন পুলিশ কমিশনার।

কিন্তু বিভিন্ন সূত্র বলছে, ‘বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রশফায়ার’ দাওয়াইও কাজে লাগছে না। এখনো সমানে দেশে প্রবেশ করছে ইয়াবা ট্যাবলেট। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে ইয়াবাসহ ধরা পড়েছেন খোদ পুলিশ সদস্যরা। মাদকবিরোধী অভিযানে কেবল বাহক কিংবা ডিলার পর্যায়ের মাদক ব্যবসায়ীরা ধরা পড়েছেন কিংবা নিহত হয়েছেন। কিন্তু গডফাদাররা পর্দার আড়ালে থাকায় ও সীমান্তে কঠোর নজরদারির অভাবে ইয়াবা আসার উৎসমুখ বন্ধ হয়নি। বন্ধ হয়নি টেকনাফের ইয়াবা গেট।

পুলিশ সদর দফতর সূত্র জানায়, সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে নির্দেশ পাওয়ার পর গত এপ্রিল-মে মাসে সারাদেশে মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ ও র‌্যাব। এর পরও জুন মাস থেকে গত ৩ মাসেও ১ কোটি পিসেরও বেশি ইয়াবা জব্দ করেছে শুধু পুলিশ ও র‌্যাব। গ্রেফতার করা হয়েছে বহু মাদক কারবারিকে। র‌্যাব-পুলিশের বাইরে সীমান্তে ও জলপথে এ অভিযান চালাচ্ছে বিজিবি ও কোস্টগার্ড। তাদের অভিযানেও ধরা পড়ছে ইয়াবার বড় বড় চালান।

সূত্র জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে এ ৫ মাসে ১ কোটি ৭২ লাখের বেশি ইয়াবা জব্দ করে বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশ ও কোস্টগার্ড সদস্যরা। নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগর হয়ে টেকনাফের ৩৪টি পয়েন্ট দিয়ে ঢুকছে ইয়াবা। গত জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত শুধু টেকনাফ উপকূল থেকে উদ্ধার হয়েছে ১ কোটি ৬০ লাখ ৭৩ হাজার পিস ইয়াবা বড়ি। এ সময় ১২৫ জন পাচারকারীকে আটক করা হলেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত কোনো হোতাই ধরা পড়েনি।

মাদকবিরোধী অভিযানে সম্পৃক্ত থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, চাহিদা থাকার কারণে অতিরিক্ত ঝুঁকি নিয়ে হলেও মাদক ব্যবসায়ীরা মাদক ব্যবসা করে যাচ্ছে। কৌশল পাল্টিয়ে চলছে ব্যবসা। এমনকি মাদক বহনও করা হচ্ছে নিত্য-নতুন কৌশলে। সূত্রগুলো বলছে, মাদক বিক্রির ক্ষেত্রে পরিচিত মাদকসেবীকে গুরুত্ব দিচ্ছে খুচরা মাদক ব্যবসায়ীরা। মাদক বহন করতে আগের চাইতে বেশি হারে ব্যবহার করা হচ্ছে নারী ও শিশুদের। এ ছাড়া বহনের ক্ষেত্রে একেবারেই নতুন ব্যক্তিকে বেশি অর্থের লোভ দেখিয়ে কাজে নিযুক্ত করা হচ্ছে।

গত ৪ মাসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ আড়াই শতাধিক মাদক কারবারি নিহত হওয়ার পরও এখনো কেন অবাধে ইয়াবাসহ মাদক আসছে। জানতে চাইলে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান বলেন, আমরা চেষ্টা করছি যাতে দেশে মাদক আসতে না পারে। তার পরও আসছে, আমরা এটা পুরোপুরি বন্ধ করতে পারিনি। আমার মনে হয় এটা বন্ধ করতে আরো সময় লাগবে। একইসঙ্গে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের হিসাব বলছে, মে মাসে সারাদেশ থেকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটগুলো ৭৩ লাখ ৪১ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করে। জুন মাসে ২৬ লাখ ৫১ হাজার উদ্ধার করে। জুলাই ও আগস্ট মাসেও এর চেয়ে একটু বেশি পরিমাণ ইয়াবাসহ মাদক উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

মাদকবিরোধী কঠোর অভিযানের পরও ইয়াবা চালান বন্ধ হচ্ছে না কেন, জানতে চাইলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মহাপরিচালক (ডিজি) মো. জামাল উদ্দীন আহমেদ বলেন, ইয়াবা চালান বন্ধ না হওয়ার প্রাথমিক কারণ হচ্ছে, মানুষ ইয়াবা সেবনে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এখন চাহিদা থাকলে তো জোগান আসবেই। তার পরও কঠোর অভিযানের কারণে আগের চেয়ে অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আসছে।

জল সীমান্তে মাদকবিরোধী অভিযান চালাচ্ছে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড বাহিনী। প্রায়ই ইয়াবাসহ বিভিন্ন চোরাচালান পণ্য জলপথে আটক করছেন এই বাহিনীর সদস্যরা। ইয়াবা পাচার বন্ধ না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে কোস্টগার্ড বাহিনীর গোয়েন্দা শাখার সহকারী পরিচালক লে. কমান্ডার আব্দুল্লাহ আল মারুফ বলেন, দেশের একশ্রেণির প্রভাবশালী অসাধু লোক এই ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। মিয়ানমার ও বাংলাদেশে অবস্থান করা কিছু রোহিঙ্গাও জড়িত আছে এই ইয়াবা ব্যবসায়ের সঙ্গে। যারা ইয়াবার সঙ্গে ধরা পড়ছে, তারা মূলত বাহক। মূল ব্যবসায়ীদের চিহ্নিত করে ধরা গেলে ইয়াবার চালান কমে আসবে।

একই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া এন্ড পিআর) মো. সোহেল রানা বলেন, মাদকবিরোধী অভিযানে গত ৩ মাসে পুলিশ ও র‌্যাব ১ কোটিরও বেশি ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ করেছে। গ্রেফতার করা হয়েছে কয়েক হাজার মাদক ব্যবসায়ীকে। এমনকি পুলিশ সদস্যদেরও ছাড় দেয়া হচ্ছে না। তিনি বলেন, আমরা নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে যাচ্ছি। মাদক কারবারিদের ধরতে নানা ছদ্মবেশে গোয়েন্দা নজরদারি চলছে। মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

Leave a Reply

এই বিভাগের আরো খবর

৯৭/৩/খ, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬
মোবাইলঃ ০১৭১২-৬৪৩৬৭৩, বার্তা বিভাগঃ ০১৭১২-৬৪৪৩৫০, সার্কুলেশন বিভাগঃ০১৯১৬০৯৯০২০
ইমেইলঃ [email protected], [email protected]

সম্পাদক:
মোঃ সুলতান চিশতী

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ
মহসিন হাসান খান (বুলবুল)

নির্বাহী সম্পাদকঃ
মোঃ ইব্রাহিম হোসেন

সহকারী সম্পাদকঃ
মোঃ আতোয়ার হোসেন

আইন উপদেষ্টাঃ
শাহিন সরকার


.: Developed By :.
Great IT