২১শে নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, হেমন্তকাল

ও বড় মানুষেরা, তোমরা কি শুনতে পাচ্ছ?

প্রকাশিতঃ আগস্ট ৮, ২০১৮, ৮:০৯ অপরাহ্ণ


গল্পটা শিশুদের। এক সাদা হাতি একটা ছোট্ট ফুলকে বাঁচানোর জন্য বনের পশুদের সঙ্গে লড়াই করে। হাতিটা ফুলটাকে শুঁড়ের মধ্যে আগলে রেখে ছোটে। দানবেরা অমরত্বের লোভে ফুলটি পুড়িয়ে সুবাস বানাতে চায়। কিন্তু হাতিটি তাদের বোঝায়, এটা নিছক ফুল নয়, এর ভেতর রয়েছে আস্ত একটা জগৎ। সেই জগতে আছে অজস্র শিশুর এক পৃথিবী।

তখন বনের রাজা জিরাফ বলে, প্রমাণ দাও যে তারা আছে?

কী প্রমাণ দেবে সরল হাতিটি আর তার শুঁড়ে আগলে রাখা ফুল-জগতের অদৃশ্য বাসিন্দারা? বন্দী হাতি তখন ফুলের ভেতর খবর পাঠায়, ‘তোমরা চিত্কার করো, তোমরা শব্দ করে জানাও যে তোমরা আছো!
ফুলের জগতে তখন বিরাট আলোড়ন জাগে। সবাই ঘরবাড়ি ছেড়ে নেমে আসে মাঠে-রাস্তায়। যার যা কিছু আছে তা বাজায়। একসঙ্গে গলা ফাটিয়ে চিত্কার করে বলে, ‘ও মানুষেরা, তোমরা কি শুনছ যে আমরা আছি?’

আমাদের শিশুদের মনেও এ রকম চিৎকার বাজছিল অনেক দিন। তারাও বলতে চাইছিল, আমরা ভালো নেই। বড়রা শুনতে পাইনি। আমরা তাদের চিনতে পারিনি। আমরা শুধু দেখেছি কিশোর গ্যাংদের, দেখেছি শুধু কিশোর অপরাধ, তাদের মধ্যে দেখিনি বড় সম্ভাবনা। তাদের মনের গভীরে সুন্দর এক বাংলাদেশের কুঁড়ি আমরা অনেকে দেখতে চাইনি। আমরা তাদের বসিয়ে রেখেছিলাম মোবাইল হাতে, টেলিভিশনের সামনে কিংবা ফেলে রেখেছিলাম পড়ার টেবিলে। আমরা শুধু দেখেছি ঐশীর খুনি হওয়া। আরও অনেক ঐশীর আবেগ সুস্থ পথ পেতে আঁকুপাঁকু করেছে,
কিন্তু সেই পথ আমরা দেখাতে পারিনি। মুক্তির জন্য ছটফট করা কোমল প্রাণের জ্বালা আমরা বড়রা, বিজ্ঞরা, ব্যক্তিগত স্বার্থের গিঁটে বাঁধা মানুষেরা টের পাইনি। আমরা তখন ছিলাম মগ্ন…

আমরা তাদের শাসন করেছি, শৃঙ্খলা শিখিয়েছি, বলেছি ‘তোমরা বোঝ না’। ঘরে ও বাইরে, মিডিয়া ও ময়দানে তাদের নসিহত করেছি। তাদের কথা না শুনে শোনাতে চেয়েছি সেসব নীতিকথা, যা আমরাই বিশ্বাস করি না। সে বিশ্বাস থাকলে তো শিশুদের পথে নামার আগে আমরাই কিছু একটা করতাম।

ওরা কিন্তু ঠিকই বিশ্বাস করেছিল আমাদের। বিশ্বাস করেছিল বাবা-মাকে, বিশ্বাস করেছিল শিক্ষকদের, হয়তো বিশ্বাস করেছিল শাসকদেরও। আমরা অনেকেই যে কথায় এক আর কাজে আরেক, আমাদের অনেকের নসিহতই যে মুখস্থ বুলি—তা তারা ভাবেনি। বরং আমাদেরই দেওয়া শিক্ষাটা তারা মনে গেঁথে নিয়েছিল।

একের পর এক শিক্ষার্থীরা যখন বাসের চাকায় পিষ্ট হচ্ছিল, তখন তারা অবাক হয়েছে। ভেবেছে কোথায় সেই শিক্ষা, পইপই করে তাদের মানতে বলা আইনগুলো কোথায়? কোথায় রাস্তার শিক্ষক পুলিশ? কোথায় রাষ্ট্রের শিক্ষক সাংসদ-নেতারা? কোথায় জাতির বিবেক? কাউকে পায়নি তারা এত দিন। তাই নিজেরাই নেমে পড়েছে রাস্তায়। এবং আশ্চর্য! আইনের শাসনের প্রতি আস্থা হারিয়ে তারা আন্দোলনের গাড়িটাকে কোনো এক মন্ত্রীর মতো উল্টো পথে নিয়ে যায়নি। নৈরাজ্য করেনি। হিংসা করেনি কাউকে, বেয়াদবি করেনি কারও সঙ্গে।

রাস্তায় নেমে শিশুরা আমাদের দেওয়া শিক্ষাটাকে সুন্দর করে আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। ভোঁতা মনটাকে কোমল আঙুলের ছোঁয়ায় সজীব করার চেষ্টা করল। আমাদের শেখানো আইন-আদব-আহ্বান মোতাবেকই তারা রাস্তা চালাতে চেয়েছে। গত কয়েক বছরের মতো বড়দের করা প্রশ্নপত্র ফাঁসের মডেলকে অস্বীকার করে, রাজনীতির বড়দের অন্যায়-দুর্নীতির মডেল বাতিল করে তারা রাস্তায় নীতি ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে। একটা দেশ যতটা অগণতান্ত্রিক, দুর্নীতিগ্রস্ত এবং দুর্বৃত্তশাসিত, সে দেশের রাস্তায় ততটা নৈরাজ্য, দুর্নীতি এবং দুঃশাসন চলতে দেখা যায়।

এক নৈতিক ঝাঁকুনি দিয়ে গেছে কিশোর আন্দোলনের লড়াকুরা। রাস্তায় মার খেয়ে, রক্তাক্ত হয়ে তারা জানিয়ে গেছে এই দেশে সুবিচার নেই, নীতির শাসন নেই, পরিবহন খাতের মাফিয়াদের মতোই এই ব্যবস্থা বেপরোয়া। একে সুস্থ না করলে আমরা জীবনবাদী বাংলাদেশ পাব না। দেশটা হয়ে উঠবে ইচ্ছাকৃত অবহেলার কাঠামোগত হত্যাকাণ্ডের লীলাভূমি। এই বার্তা তারা শুধু সতেরো কোটি বাংলাদেশিকেই জানায়নি, জানিয়ে দিয়েছে বিশ্বকেই। বাংলাদেশের এসওএস (সেইভ আওয়ার সোউল) বার্তাটা জানাতে হলো সমাজের পরিবারের সবচেয়ে কোমল নিষ্পাপ ও দুর্বল অংশটাকেই। কারণ, উটপাখিরা গর্তে মুখ লুকিয়ে ছিল।

তারা যে রাষ্ট্র মেরামতের ডাক তুলেছিল, সেই কাজ বলপ্রয়োগে থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। নাগরিকেরা হঠাৎ উদাসীন হয়ে গেছেন। গোড়াতেও শিশুমনের ধিকিধিকি দুঃখটা আমরা চিনতে না পেরে তাদের ‘ফার্মের মুরগি’ ভেবেছি, মোবাইল ফোনাসক্ত প্রজন্ম ভেবেছি, বিচ্ছিন্ন প্রজন্ম ভেবেছি। তাদের পাশে যখন সবচেয়ে বেশি দাঁড়ানো দরকার, তখনো সন্তোষজনকভাবে আমরা তাদের আগলে রাখতে পারিনি। নিরাপত্তা দিতে পারিনি।

কারও পদত্যাগের ডাকেও নাহয় না–ই বা সাড়া দিলাম। নতুন পরিবহন আইনের ফাঁক ও ফাঁকি নিয়েও নাহয় কথা না-ই বললাম। ছাত্রছাত্রীদের রক্তাক্ত ছবিগুলোকেও নাহয় ভুলে গেলাম। কিন্তু তারা যে ক্লাসে ফিরল, যে পরিবারে ফিরল, যে সড়ক ধরে আবার তারা চলতে লাগল, সেসব কি সুস্থ ও নিরাপদ হলো? সব শিক্ষাঙ্গনকে শিশুবান্ধব আলোকিত বিদ্যালয় কি আমরা বানানো শুরু করব? আমরা কি পরিবারগুলোকে শিশুর বিকাশের মুক্তাঙ্গন বানাতে চাইব? আমরা কি শিশু-কিশোরদের মাঠের খেলাধুলার সুযোগ দিতে পারব? আমরা কি সবুজ পরিবেশ দিতে পারব তাদের? আমরা কি দেশটাকে সবার জন্য নিরাপদ করতে পারব? সড়ক যোগাযোগব্যবস্থাও কি একশ্রেণির মাফিয়া মালিক চক্র বা নেশাখোর অযোগ্য চালকমুক্ত হবে? খেয়াল করুন, তারা কিন্তু শুধু রাস্তা নয়, সব ক্ষেত্রেই মানবিকতা চেয়েছে, তারা চেয়েছে ন্যায়বিচার। তাদের স্লোগান ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’। আমরা কি সবার প্রতি সুবিচার প্রতিষ্ঠার কাজ করতে পারব?

নাকি আবারও আমরা তাদের ব্যর্থ করে দেব? ভাবব, সব ঠিক আছে! বড়দের শহর ঢাকা আবার ফিরে যাবে বড়দের তৈরি করা সংকটের চক্রে? জাতির অভিভাবকেরা কি শিশুদের থেকে সঠিক শিক্ষাটা নিলেন?

Leave a Reply

৯৭/৩/খ, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬
মোবাইলঃ ০১৭১২-৬৪৩৬৭৩, বার্তা বিভাগঃ ০১৭১২-৬৪৪৩৫০, সার্কুলেশন বিভাগঃ০১৯১৬০৯৯০২০
ইমেইলঃ [email protected], [email protected]

সম্পাদক:
মোঃ সুলতান চিশতী

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ
মহসিন হাসান খান (বুলবুল)

নির্বাহী সম্পাদকঃ
মোঃ ইব্রাহিম হোসেন

সহকারী সম্পাদকঃ
মোঃ আতোয়ার হোসেন

আইন উপদেষ্টাঃ
শাহিন সরকার


.: Developed By :.
Great IT