২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ৯ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, শরৎকাল

একা হাঁটছে ইসলামী আন্দোলন

প্রকাশিতঃ সেপ্টেম্বর ৫, ২০১৮, ১১:৪২ পূর্বাহ্ণ


১৯৮৭ সালে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন নামে চরমোনাইর তৎকালীন পীর সৈয়দ মোহাম্মদ ফজলুল করিম যে দলটি গঠন করেছিলেন সে দলটির বর্তমান নাম ‘ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ’। ২০০৮ সালে এ নামেই দলটি নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নিবন্ধন নেয়। তারা ইসিতে ৩৪ নম্বর নিবন্ধনভুক্ত দল। দলটির বর্তমান আমির প্রয়াত সৈয়দ ফজলুল করিমের পুত্র মুফতি সৈয়দ রেজাউল করীম। ইসলামী হুকুমাত অর্থাৎ ইসলামী শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাই দলটির লক্ষ্য। তাদের মার্কা হাতপাখা। মহাজোট, ২০ দলীয় জোট, সম্মিলিত জাতীয় জোট কোনোটারই শরিক নয় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। একলাই চলেছে পথ। আর একলা চলতে চলতেই একক রাজনৈতিক দল হিসেবে তৃতীয় বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে এরই মধ্যে নিজেদের অবস্থান জানান দিয়েছে দলটি। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত কয়েকটি সিটি নির্বাচনে দলটির প্রার্থীরা যে ভোট পেয়েছেন সে ভোট অনুযায়ী তৃতীয় অবস্থানেই রয়েছে তারা।

গত কয়েক বছরে ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ, নারায়ণগঞ্জ, রংপুর ও খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফলাফলে দেখা গেছে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থীরা উল্লেখযোগ্য ভোট পেয়ে তৃতীয় স্থান দখল করেছেন। ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তৃতীয় অবস্থানে ছিল ইসলামী আন্দোলন। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটিতে  দলটির প্রার্থী শেখ ফজলে বারী মাসউদ পেয়েছিলেন ১৮ হাজার ৫০ ভোট। দক্ষিণ সিটিতে আব্দুর রহমান পান ১৪ হাজার ৭৮৪ ভোট। তার পরের বছর ২০১৬ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনেরও তৃতীয় স্থান লাভ করেন ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মুফতি মাছুম বিল্লাহ। তিনি পেয়েছিলেন ১৩ হাজার ৯১৪ ভোট। একইভাবে চলতি বছরের ১৫ মে অনুষ্ঠিত খুলনা সিটি নির্বাচনে দলটির প্রার্থী মাওলানা মুজাম্মিল হক পান প্রায় ১৫ হাজার ভোট। তিনিও এখানে তৃতীয় অবস্থান দখল করেন। সংসদে প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির মেয়র প্রার্থী এ সিটিতে ভোট পেয়েছেন মাত্র ১ হাজার ৭২৩ ভোট। চলতি বছরের জুন মাসে অনুষ্ঠিত গাজীপুর সিটি নির্বাচনেও চমক দেখায় চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন এ দলের প্রার্থী নাসির উদ্দিন। এ নির্বাচনে ২৬ হাজার ৩৮১ ভোট পেয়ে তৃতীয় অবস্থানে ছিলেন তিনি। গত বছর ডিসেম্বরে এরশাদের ঘাঁটিখ্যাত রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী এটিএম গোলাম মোস্তফা ২৪ হাজার ৬ ভোট পেয়ে চতুর্থ হন। শুধু একটি সিটিতেই হাতপাখার প্রার্থী চতুর্থ হয়েছেন। এছাড়া জুলাইয়ের শেষদিকে অনুষ্ঠিত রাজশাহী সিলেট বরিশাল সিটি নির্বাচনেও প্রায় একই অবস্থা ছিল ইসলামী আন্দোলনের। কিন্তু ব্যাপক অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ তুলে এ তিন সিটিতে নির্বাচন বর্জন করে দলটি।

একাদশ জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেছে। পীরকেন্দ্রিক এ দলটি এরই মধ্যে সারা দেশে ৩০০ আসনে প্রার্থী তালিকা তৈরি করেছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। কোনো জোটভুক্ত না হয়েই তারা নির্বাচনে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। গত কয়েক বছরে বিভিন্ন নির্বাচনে তাদের প্রার্থীদের প্রাপ্ত উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভোটকেই শক্তি হিসেবে দেখছেন দলটির শীর্ষ নেতারা। এখনই তারা মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে না পারলেও অচিরেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। কারণ ধীরে ধীরে দলটির ভোট বাড়ছে।

জাতীয় নির্বাচনকে মাথায় রেখে দলটি স্থানীয় সরকারের একেবারে তৃণমূল পর্যায়-ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও প্রার্থী দিয়ে নির্বাচনী ‘ওয়ার্ম আপ’ করে আসছিল কয়েক বছর ধরেই। চীনা বিপ্লবের নেতা মাও সেতুংয়ের গ্রাম থেকে শহর দখলের সূত্রকে প্রকৃতভাবেই কাজে লাগাচ্ছে ইসলামী আন্দোলনের নেতারা। কয়েক বছর ধরে তারা দেশে অধিকাংশ ইউনিয়ন পরিষদে প্রার্থী দিয়ে আসছে। হারুক বা জিতুক প্রার্থী দেওয়ার মধ্য দিয়ে দল এবং মার্কা পরিচিত করানোর ক্ষেত্রে তারা নিরলস কাজ করছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। অনেকে বলছেন, ধর্মভিত্তিক দল হওয়ায় সাধারণ মানুষের মাঝে সহজেই জায়গা করে নিচ্ছে ইসলামী আন্দোলন। যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলাম গ্রামেগঞ্জে ইতোমধ্যেই ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীদের জনপ্রিয়তার কাছে ধরাশায়ী হচ্ছেন। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, ইসলামী আন্দোলনের নেতারা কট্টরভাবে জামায়াতের ইসলামী দর্শন ও রাজনৈতিক মতাদর্শের সমালোচক। বিভিন্ন ধর্মীয় সভায় তারা প্রকাশ্যে জামায়াতের বিরুদ্ধে কথা বলেন। ফলে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের কাছে দলটির জনপ্রিয়তা বাড়ছে।

ইউপি নির্বাচনগুলোতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে দলটির প্রার্থীরা বিজয়ী না হলেও দ্বিতীয় বা তৃতীয় অবস্থানেই রয়েছে। দলটির প্রচার বিভাগ জানিয়েছে, দেশে এক হাজারের বেশি ইউপি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন দলটির মনোনীত প্রার্থীরা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় ইসলামী আন্দোলনের মতো দলের ভোট বাড়ছে। তাদের ভোট বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ। অন্যদিকে দিন দিন মানুষের ক্রমান্বয়ে ধর্মাশ্রয়ী হয়ে পড়ার বিষয়টিও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে কি না সেটাও ভেবে দেখা দরকার বলে মনে করছেন অনেকে। আবার কেউ বলছেন, প্রধানত পীরকেন্দ্রিক দল হওয়ায় দেশের শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে দলটির জনপ্রিয়তা বাড়ছে। তার ওপর সারা দেশে সংগঠনটির সক্রিয় কার্যক্রম রয়েছে। ফলে ক্রমান্বয়ে দলটির গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে ধর্মপ্রাণ মানুষের মাঝে।

১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই জাতীয় নির্বাচনেও অংশ নিচ্ছে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন বা ইসলামী আন্দোলন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে ইসলামী ঐক্যজোটের হয়ে নির্বাচন করেন তারা। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেয়। সে বছর ২০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সর্বমোট ১১ হাজার ১৫৯টি ভোট পায় দলটি। ২০০১ সালে জাতীয় পার্টির সঙ্গে জোট বেঁধে ২৩টি আসনে নির্বাচন করে। ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শতাধিক আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৭ লাখ ৩৩ হাজার ৯৬৯টি ভোট পায় ইসলামী আন্দোলন।

ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক মাওলানা আহমদ আবদুল কাইয়ূম গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আগামী নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনাই তাদের রয়েছে। তবে ফলপ্রসূ ঐক্য হলে তারা জোটগত নির্র্বাচনও করতে পারে। এখন পর্যন্ত ৩০০ আসনে প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের শক্তি আমাদের সংগঠন। সব জেলা ও উপজেলায় দলের কমিটি রয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিটি রয়েছে ১১শ’ ইউনিয়নে। প্রায় ৮০ শতাংশ ইউনিয়নে আমাদের দল সক্রিয়।

Leave a Reply

৯৭/৩/খ, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬
মোবাইলঃ ০১৭১২-৬৪৩৬৭৩, বার্তা বিভাগঃ ০১৭১২-৬৪৪৩৫০
ইমেইলঃ [email protected], [email protected]

সম্পাদক:
মোঃ সুলতান চিশতী

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ
মহসিন হাসান খান (বুলবুল)

নির্বাহী সম্পাদকঃ
মোঃ ইব্রাহিম হোসেন

সহকারী সম্পাদকঃ
মোঃ আতোয়ার হোসেন

আইন উপদেষ্টাঃ
শাহিন সরকার


.: Developed By :.
Great IT