১৩ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ২৯শে কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, হেমন্তকাল

আলীম হায়দারের ‘ব্যক্তিত্ববাদ’: আভিজাত্য ও অন্তর্বেদনার কাব্য

প্রকাশিতঃ নভেম্বর ৪, ২০১৮, ১২:৩১ পূর্বাহ্ণ


কোনো কবিতার বইয়ের রিভিউ লিখছি এই প্রথম। হিম হিম আয়োজনে এই রাতকে করেছি কাব্যপাঠের উপলক্ষ। ‘ব্যক্তিত্ববাদ’ পড়ে বুকের ভেতর জেগে উঠল এক বিষণ্ণ বিদ্রোহ। সোজাসাপ্টা সরলতা আর নুয়ে থাকা অহংকারের অপূর্ব সম্মিলন পেলাম আলীম হায়দারের কাব্যভাষায়। ব্যক্তি আলীম হায়দারের সঙ্গে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা অনেক আগে। কিন্তু তার কবিতাকে অনুভব করার জন্য এমন হেমন্তের একটি রাত যেন আকাঙ্ক্ষিত ছিল। পঙক্তিতে নতুন করে খুঁজে পেলাম আলীম হায়দারের বিশ্বাস ও বয়ে নেয়া বেদনাকে।

সূচির প্রথম নামকবিতার কথাই ধরা যাক। একাকীত্বের স্বরূপ ও সৌন্দর্য কবি ফুটিয়ে তুলেছেন দারুণভাবে। আনন্দ-বেদনার অনুভব, শুদ্ধতা পবিত্রতার ছবক, সে তো কেবল একাকীত্বই দিতে পারে। কবির চোখে তাই একক চৈতন্য ব্যক্তিত্ববাদ হিসেবে ধরা দেয়। তিনি তার ভাবনার দিগন্তে পরিভ্রমণ করতে করতে অনুসিদ্ধান্তে উপনীত হন এই বলে যে, ‘একনায়করাই শ্রেষ্ঠ/ ঈশ্বর একক ও একা; সংঘবদ্ধরা শয়তান।’

কবির এই দর্শনের সত্যতা ইতিহাস ঘাঁটলেই মিলে যাবে। ঐক্যবদ্ধতা বেশিরভাগ সময় দুর্বৃত্তপনার কাজে লেগেছে। সংঘবদ্ধরা সবসময় সংগ্রাম করে না, তারা স্বার্থসিদ্ধি করে। আর ক্ষতিটাও করে বসে। ‘কিংবদন্তি’ কবিতায় কবির সতর্ক সহজ উচ্চারণ, ‘কিছু কিছু আলিঙ্গন এড়িয়ে যেতে হয়/ কখনো কখনো চুম্বনও বিষাক্ত লালা ছড়ায়।’ ‘আধুনিক ছাত্ররাজনীতির হালচাল’ কবিতায় তিনি বলেন, ‘তথাকথিত হেভিওয়েট ছাত্রনেতারা/ আজকাল/ মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রীদের পিএস এপিএস হওয়ার জন্যই ব্যস্ত/ অথবা বুঁদ হয়ে গেছে ব্যবসাতে/ নেতৃত্বের মান কত নিচে নেমে গেছে এখন বুঝো তাহলে… ওরা আজ দেশ চালানোর স্বপ্ন দেখে না… ছাত্ররাজনীতি মানে অভিজাত তারুণ্য/ কিন্তু ওরা তস্কর, জ্বি হুজুর জ্বি হুজুর সামান্য লাঠিয়াল মাত্র।’

‘মৌলবাদ’ কবিতায় মনুষ্যশত্রুর মুদ্রার এপিট ওপিঠ কত সাবলীল ও সততার সঙ্গে কবি তুলে ধরেছেন। সমান্তরাল সমীকরণে আলীম হায়দার বলেন, ‘আক্রমণকারীরা কখনোই মানবতাবাদী নয়, সেটা চাপাতিতে হোক কিংবা কলম-কীবোর্ডে।’ কবিহৃদয় দগ্ধ হয় এটা দেখে যে, কোথাও মানবতাবাদের শিক্ষা নেই। মানুষকে একটা মৃতপ্রাণ যন্ত্র করে গড়ে তুলছে এই পুঁজিবাদী সভ্যতা। ‘হৃদয়ের মনোলোভা গ্রেনেড’ কবিতায় তিনি লিখেছেন, ‘তোমার স্ত্রী ও পিতামাতা তোমাকে ধনবান দেখতে চায়/ ক্ষমতাবান দেখতে চায়/ তুমি স্বাস্থ্যবান না থাকলেও ওদের কিছু যায় আসে না/ তোমাকে স্যুটসজ্জিত লাশ বানিয়ে ওরা মিষ্টি বিলানোর উৎসব খুঁজছে।… উলু উলু প্রেমিকারা তোমাদের ঊরুতে ওজোন রেখে/ কানের সাথে জিভ ছুঁয়ে বলছে- তুমি মরো/ নইলে এ প্রণয়ের পরিণাম কী হবে?/ তোমার কফিনে ছিটানোর জন্য অজস্র লাল গোলাপ রেডি আছে। … আরো এক ধাপ এগিয়ে আছে ওইসব মানুষ বানানোর কারখানা/ যেখানে তুমি মহত্তের শিক্ষা নিতে গিয়েছিলে/ চুল পানিটেল করা উদাম উদরের কিছু রঙিন রক্ষিতা এসে/ তোমাকে শুধু কামাই করার তালিম দিয়ে গেছে।’

কবিতায় কবিতায় এভাবে কবি আলীম হায়দার অসামঞ্জস্যের গায়ে আলো ফেলেছেন। আর বুক চিতিয়ে মেরুদণ্ড সোজা রাখার সাহস জুগিয়েছেন। ‘বেঁচে থাকে অদম্য আশা’ কবিতায় তিনি বলেছেন, ‘অশরীরী আমাকে-আমার তীব্র স্বাধীনতাকে- সবুজ স্বপ্নের বাসনাকে/ ঠেকাতে পারবে না কেউ কিছুতে।

আমার ভালো লেগেছে ব্যক্তিজীবনেও আলীম হায়দার এমনই ব্যক্তিত্বের অধিকারী। সাহিত্যের আবরণে সততার সওদা করা কিংবা শিল্পের রঙে মানবতার মুখোশ চড়াননি। এমনই ঋজুতা, রক্ষণশীলতা, উড়নচণ্ডী আদর্শিকতা ও প্রতিবাদী মানসিকতা নিয়ে তিনি জীবন কাটাচ্ছেন। তাতে হয়ত বঞ্চিত হচ্ছেন ভেসে বেড়ানো রূপ, রস ও রুটি থেকে। তাতে কিছুই যায় আসে না। দিনশেষে কবি নিজেকে প্রেমিক ভেবেই সান্ত্বনা খোঁজেন। প্রেমেও তিনি দুরন্ত দুর্বিনীত আর ব্যক্তিত্বসচেতন। ‘কই সেই আকাঙ্ক্ষিতা’ কবিতায় তাই বলেন, ‘এইসব প্রেমিকরা প্রেম জানে না, শুধুই মাংস ঘাটাঘাটি/ প্রেমিকারা খাই খাই, একেকটা ক্ষুধার্ত গিরি… এইসব প্রেমে আমার পোষায় না, আমি দীর্ঘমেয়াদী শান্তি চাই/ আমার এমন এক প্রেমিকা চাই- যে শটগানের মুখে দাঁড়িয়েও বলতে পারে- আমি শুধু তোমাকে চাই।’ প্রেমিকাকে তিনি সোজাসাপ্টা বলতে পারেন, ‘কাছে আসো- আরো কাছে- সুখ দাও ঘন আঁচে/ ….চেপে ধরো সজোরে বুক- ওই বুকবালিশে/ তছনছ হয়ে যাব বৃন্ত-বেয়নেটে।’

উদ্ধৃতি হয়ত বেশি দিয়ে ফেলছি। কাব্যগ্রন্থের রিভিউ এজন্য দুরূহ লাগে। কবির পরিচয় কোনো আলোচনা ব্যাখ্যাতে নয়, কবিতার পঙক্তিতে লুকিয়ে থাকে। উপর্যুক্ত পর্যালোচনায় আলীম হায়দারের স্বাতন্ত্র্য ও সৌন্দর্যবোধ আশা করি অনেকটাই স্পষ্ট। মোটাদাগে আমার কাছে মনে হয়েছে আলীম হায়দারের এই গ্রন্থটি আভিজাত্য ও অন্তর্বেদনার কাব্য। শক্ত শিরদাঁড়া নিয়ে তিনি আঘাত করেছেন সংকীর্ণ স্বার্থলোভী চক্রকে। এই পরিক্রমায় প্রকাশ পেয়েছে তার নিজের মর্মবেদনা। প্রেম আর সংসার দুটোকেই দেখেছেন নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে। বেছে নিয়েছেন স্বতন্ত্র আঙ্গিক। কবির শক্তি আরও শাণিত হোক। ২০১৬ সালে প্রকাশিত ‘ব্যক্তিত্ববাদ’ বইটি তার তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ। ‘বাংলা বই’ থেকে প্রকাশিত বইটি পাওয়া যাচ্ছে রকমারি ডটকমে। বইটির লিংক পেতে ক্লিক করুন: https://www.rokomari.com/book/113218/bektitwobad?ref=null

লেখক: তানিম ইশতিয়াক, প্রভাষক, পটুয়াখালী সরকারি কলেজ।

Leave a Reply

৯৭/৩/খ, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬
মোবাইলঃ ০১৭১২-৬৪৩৬৭৩, বার্তা বিভাগঃ ০১৭১২-৬৪৪৩৫০, সার্কুলেশন বিভাগঃ০১৯১৬০৯৯০২০
ইমেইলঃ [email protected], [email protected]

সম্পাদক:
মোঃ সুলতান চিশতী

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ
মহসিন হাসান খান (বুলবুল)

নির্বাহী সম্পাদকঃ
মোঃ ইব্রাহিম হোসেন

সহকারী সম্পাদকঃ
মোঃ আতোয়ার হোসেন

আইন উপদেষ্টাঃ
শাহিন সরকার


.: Developed By :.
Great IT