২৩শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ৮ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, শরৎকাল

আমেরিকার মুসলমানদের হালচাল

প্রকাশিতঃ জানুয়ারি ২, ২০১৮, ১২:০৯ অপরাহ্ণ


‘অ্যাসোসিয়েশন
অব স্ট্যাটিস্টিশিয়ান্স অব
আমেরিকান রিলিজিয়াস
বডিস’ এর জরিপ মতে, ২০০০ সালে মুসলমানের সংখ্যা যেখানে ১০ লাখ ছিল, ২০১০ সালে
তা  বেড়ে দাঁড়ায় ২৬ লাখে।
আর এখন তা ৫০
লাখের ওপরে

ইসলাম, মুসলমান, পবিত্র কোরআন ও মহানবী (সা.) এর বিরুদ্ধে পরিকল্পিত অপপ্রচারের মাধ্যমে বিশ্বের অন্যান্য ধর্মের অনুসারীদের মুসলমানদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়ায় তাদের বিপন্ন ও ধ্বংস করার যে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, তার নানামাত্রিক প্রতিক্রিয়া পড়তে শুরু করেছে বিশ্বজুড়েই। বিশ্বের সুপার পাওয়ারখ্যাত খোদ আমেরিকা এ উনুনে শুকনো খড় ছিটাচ্ছে। বর্তমান প্রেসিডেন্ট তার বহু বিবৃতি ও ভাষণে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্রমাগত বিদ্বেষ ছড়াচ্ছেন।
খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, আফ্রিকান আমেরিকানরা সাম্প্রদায়িক বৈষম্য ও দুর্ভোগের শিকার হয়ে আসছিলেন। এতে মার্কিন সমাজে যে বিরূপ পরিস্থিতি তৈরি হয়, তা থেকে কোনো শিক্ষা না নিয়েই তিনি এসব প্রলাপ বকছেন। বিদ্বেষ সৃষ্টিকারীরা ভুলে যাচ্ছেন কিংবা ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করছেন আমেরিকায় মুসলমানদের আত্মত্যাগ, কীর্তি ও অবদানের কথা। যে দেশে মুসলমানরা সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, অর্থনীতি, সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে এ মহান জাতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। শিকাগোতে অবস্থিত বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভবন উইলস হ্যানকক টাওয়ার। এর ডিজাইন তৈরি করেন একজন আমেরিকান মুসলমান। আমেরিকার মুসলমানরাই কেমোথেরাপির মেশিনের উন্নয়ন সাধন করেছেন। বর্তমানে এ যন্ত্রটি ব্রেইন টিউমার চিকিৎসায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তারা দেশের মূল চিত্রশিল্প জাজের ক্ষেত্রে বিপ্লব সাধন করেছেন। তারা শিক্ষক, আইনপ্রণেতা, ক্রীড়াবিদ ও সৈনিক হিসেবে সেবামূলক খাতের উন্নতি সাধন করছেন। কংগ্রেসেও রয়েছেন দুইজন মুসলমান সদস্য। (সূত্র : হাফিংটন পোস্ট)।


আমেরিকায় আগামী দশকগুলোতে মুসলিম জনসংখ্যা দ্বিগুণ আকার ধারণ করবে। কেননা মুসলিম জনসংখ্যা ২০১০ সালের হিসাব অনুযায়ী ২ দশমিক ৬ মিলিয়ন থেকে ২০৩০ সাল নাগাদ ৬ দশমিক ২ মিলিয়নে পরিণত হবে বলে পিউ রিসার্চের জরিপ পূর্বাভাস দিয়েছে। আমেরিকার মোট জনসংখ্যার শূন্য দশমিক ৮ ভাগ থেকে তারা তখন ১ দশমিক ৭৭ ভাগে উন্নীত হবেন বলে পিউ ব্যাখ্যা দেয়। আরেক জরিপ সংস্থা ‘অ্যাসোসিয়েশন অব স্ট্যাটিস্টিশিয়ান্স অব আমেরিকান রিলিজিয়াস বডিস’ এর জরিপ মতে, ২০০০ সালে মুসলমানের সংখ্যা যেখানে ১০ লাখ ছিল, ২০১০ সালে তা  বেড়ে দাঁড়ায় ২৬ লাখে। আর এখন তা ৫০ লাখের ওপরে। এসব কীসের ইঙ্গিত বহন করে? তারা যদি এতই হীন ও অপদার্থ হতেন, তাহলে কী করে বিভিন্ন শহরের মেয়র, জজ ও অঙ্গরাজ্যে আইনসভার সদস্য হিসেবে বিশাল দায়িত্ব পালন করছেন? এসব সত্যাসত্য দূর থেকে আমরা কিছু দেখি না। তবে মিডিয়ার কল্যাণে কিঞ্চিৎ অনুমান ও অনুধাবন করি মাত্র।
যাক, নতুন বছরের প্রারম্ভলগ্নে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশের মুসলমানদের নিয়ে আমরা আর হতাশার বাণী শুনতে বা শোনাতে চাই না। আশাবাদ ও উৎসাহব্যঞ্জক কিছু জানা যাক। নিউইয়র্ক থেকে প্রবাসী সাংবাদিক রশীদ জামিল একটি জাতীয় সাপ্তাহিক পত্রিকায় লিখেছেনÑ মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক বা ব্যবহার কেমন, সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। সে নিয়ে কথা বললে অনেক কথার অবতারণা হতে পারে। কিন্তু এখানে, এ আমেরিকায় ইসলাম অনেক ভালো আছে। তথ্যেও, বাস্তবেও।
আবার ২০০০ সালে যেখানে আমেরিকার মসজিদের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ২০০, বর্তমানে সেখানে মসজিদের সংখ্যা ২ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। খোদ টুইন টাওয়ার, বর্তমানে যেটা ফ্রিডম টাওয়ার নামে নতুন করে নির্মিত হয়েছে, তার পাশেই গড়ে উঠেছে আল্লাহর ঘর, চমৎকার একটি মসজিদ। এমন কোনো দিন নেই যেদিন নিউইয়র্কের কোনো না কোনো মসজিদে কোনো না কোনো মাহফিল হচ্ছে না।
মুফতি মুহাম্মাদ রফী উসমানী বলেছেন, আলহামদুলিল্লাহ, তাবলিগ জামাতের কাজ অত্যন্ত ব্যাপকভাবে হচ্ছে। অসংখ্য মানুষ এর দ্বারা উপকৃত হচ্ছে। দ্বীনি সচেতনতা সৃষ্টিতে এ জামাত অত্যন্ত সফল। আমাদের তাবলিগ জামাত যে খিদমত আঞ্জাম দিচ্ছে, তার কোনো নজির কোনো মিশনারি দলের মধ্যে পাওয়া যাবে না। খ্রিষ্টানরা তাদের ধর্ম-প্রচারের জন্য অঢেল সম্পদ ব্যয় করছে, গোটা পৃথিবীতে অসংখ্য সংগঠন মিশনারি কর্মকা-ে তৎপর রয়েছে। কিন্তু তাবলিগ জামাত যে কাজ করছে তার সঙ্গে কোনো তুলনাই হতে পারে না ওইসব মিশনারি সংগঠনের। শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কত মানুষ নিজের সামান নিজে বহন করছেন, নিজের খরচে দেশ-বিদেশে সফর করছেন এবং ঈমান-আমলের দাওয়াত পৌঁছে দিচ্ছেন। গত বছর ফিলাডেলফিয়ায় অনুষ্ঠিত তাবলিগের তিন দিনের ইজতেমায় ১২ থেকে ১৫ হাজার মুসলমানের আল্লাহু আকবরের ধ্বনিতে মুখর হলো আমেরিকার আকাশ। হলভর্তি মানুষের সামনে বয়ান রাখলেন বিশ্ব তাবলিগ জামাতের মুরব্বিরা। ছয়জন খ্রিষ্টান মুসলমান হলেন। কোনো রকম বাধা-বিঘœ ছাড়াই প্রশাসনিক সহযোগিতায় সম্পন্ন হলো এ জমায়েত।
বর্তমানে আমেরিকায় ২ দশমিক ৬ মিলিয়ন মুসলমান শুক্রবার মসজিদে যান। ৪০ ভাগ আমেরিকান মুসলমান নিয়মিত মসজিদে যান। শুধু পুরুষই নন, নারীরাও মসজিদে যান। প্রতিটি মসজিদেই নারীদের জন্য আলাদা নামাজের ব্যবস্থা রয়েছে। আমেরিকার মসজিদগুলোর ইমামরাও ধর্মীয় ও আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত। যে কোনো ধর্মীয় সমস্যার সমাধান দিতে তারা সক্ষম। ইসলাম সম্পর্কে জানার আগ্রহ থেকে এখানকার মুসলমানরা দিন দিন মসজিদমুখী হচ্ছেন। বর্তমানে আমেরিকায় ইসলাম সবচেয়ে দ্রুতগতিসম্পন্ন ধর্ম। এছাড়া মুসলমানরাও আস্তে আস্তে নিজেদের ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হচ্ছেন। ইসলাম ও মুসলমান সম্পর্কে যে ভুল বোঝাবুঝি রয়েছে, তা নিরসনের চেষ্টা করছেন। এ ক্ষেত্রে তরুণরা ইন্টারনেটকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। (সূত্র : দেশে দেশে ইসলাম ও মুসলমান : পৃষ্ঠা ২০)।
আমেরিকায় বসবাসরত মুসলমানের মধ্যে বিরাট সংখ্যক তরুণ নিয়মিত মসজিদে যায়। এসব তরুণ সম্পর্কে কোনো কোনো গণমাধ্যম অপপ্রচার চালাচ্ছেÑ তারা মৌলবাদ ও চরমপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ছে। কিন্তু দেশটির শতকরা ৮৭ ভাগ মুসলিম নেতা ও ইমাম তাদের নিজেদের অভিজ্ঞতার আলোকে বলেছেন, মুসলিম তরুণদের মধ্যে চরমপন্থা বাড়ছে না। ইসলামে আল্লাহর ওপর নির্ভরতা, এক খোদার প্রতি আনুগত্য, যে কোনো কুসংস্কার থেকে দূরে থাকা, মানবীয় মূল্যবোধ রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়ায় এবং সর্বোপরি পবিত্র কোরআন শরিফে আজ পর্যন্ত কোনো বিকৃতি না ঘটায় যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোতে ক্রমেই ইসলামের প্রতি মানুষের ঝোঁক বাড়ছে।
শুধু তাই নয়, তারা নিজেদের সংগঠিত করতে শুরু করেছেন। প্রধান প্রধান নির্বাচনগুলোতে প্রভাব বিস্তার করছেন। গড়ে তুলছেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান; যাতে সম্প্রদায়ের স্বার্থ সুরক্ষিত হয়। ফ্লোরিডা, ভার্জিনা, ওহিও, মিশিগান প্রভৃতি অঙ্গরাজ্যের বিভিন্ন আসনে মুসলিম প্রার্থীদের প্রভাব বাড়ছে। এসব রাজ্যে আছে এক মিলিয়ন মুসলিম ভোটার।
নিরাশার চোরাবালি ডিঙিয়ে আমেরিকান মুসলমানরা ধীরে ধীরে আসন গাড়তে যাচ্ছেন সবুজাভ প্রান্তরে। বিশ্ববিখ্যাত সাপ্তাহিক টাইম ম্যাগাজিনের ১৯ আগস্ট ২০১৫ সংখ্যায় ববি ঘোষ বিভিন্ন জরিপসহ আমেরিকার মুসলিম সম্প্রদায়ের সাম্প্রতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে লেখা থেকে এমন উৎসাহবাহী ইঙ্গিত পাই। সেখানে তিনি লেখেন, মুসলিম সংখ্যালঘু অন্যান্য দেশের তুলনায় আমেরিকায় ইসলামভীতি তুলনামূলক কম। ফ্রান্সে বোরকার ওপর নিষেধাজ্ঞা অথবা মিনার নির্মাণের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে সুইজারল্যান্ডের নতুন আইনের মতো আমেরিকায় তেমন কিছু নেই। জনমত জরিপে দেখা গেছে, পশ্চিমা বিশ্বের অন্য যে কোনো দেশের তুলনায় আমেরিকায় মুসলমানরা নিজেদের বেশি নিরাপদ ও মুক্ত মনে করেন। কয়েক বছর আগে রিমা ফাকিহ নামের এক নারী প্রথমবারের মতো কোনো মুসলমান নারী হিসেবে মিস ইউএসএ নির্বাচিত হয়েছেন। ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলিতে দেশটির প্রথম মুসলিম কলেজ রয়েছে। যার লক্ষ্য হচ্ছেÑ ‘যেখানে ইসলাম আমেরিকার সঙ্গে মিলিত হয়।’ ববি ঘোষের মতে, ইসলামের নিন্দুকদের কল্যাণে ইসলামবিরোধী প্রচারণা মানুষের কাছে খুব পরিচিত হয়ে গেছে।
তবে আমেরিকার মুসলমানদের ভুলে গেলে চলবে না যে, এসব দেশে আমাদেরই মুসলিম জাতির প্রতিনিধি মনে করা হয়। আমাদের কাজকর্ম, আচার-ব্যবহারের দ্বারা অমুসলিমরা ইসলাম সম্পর্কে অনুমান করার চেষ্টা করে। এ জন্য আমাদের অত্যন্ত সতর্ক ও সংযমী হওয়া চাই। পাড়া-প্রতিবেশী, সহকর্মী এবং সাধারণ অমুসলিমদের সঙ্গেও ভদ্র ও শালীন ব্যবহার করা কর্তব্য। আমরা নিশ্চয়ই জানি, যে কোনো ধরনের জুলুম, অত্যাচার, ওয়াদাখেলাপি, আমানতে খেয়ানত যেমন একজন মুসলমানের সঙ্গে করা নাজায়েজ, তেমনি একজন অমুসলিমের সঙ্গেও। মানুষ তো মানুষ, কোনো পশু-পাখির প্রতিও অবিচার করা ইসলামে নিষেধ।
এটা ঠিক যে, গোটা বিশ্বে বিশেষত পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে মুসলমানরা বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন; কিন্তু একই সঙ্গে ইসলামের পুনর্জাগরনের সব আলামতও সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এটাই ইংরেজি নববর্ষে আমাদের সান্ত¡না হয়ে থাক!

Leave a Reply

৯৭/৩/খ, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬
মোবাইলঃ ০১৭১২-৬৪৩৬৭৩, বার্তা বিভাগঃ ০১৭১২-৬৪৪৩৫০
ইমেইলঃ [email protected], [email protected]

সম্পাদক:
মোঃ সুলতান চিশতী

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ
মহসিন হাসান খান (বুলবুল)

নির্বাহী সম্পাদকঃ
মোঃ ইব্রাহিম হোসেন

সহকারী সম্পাদকঃ
মোঃ আতোয়ার হোসেন

আইন উপদেষ্টাঃ
শাহিন সরকার


.: Developed By :.
Great IT