১৯শে নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, হেমন্তকাল

আমি সাধারণ মানের অভিনেতা

প্রকাশিতঃ ফেব্রুয়ারি ১, ২০১৮, ৭:১৫ অপরাহ্ণ


ব্রিথ-এর ট্রেলার দেখে মনে হচ্ছে এক অন্য মাধবনকে দেখা যাবে এই ওয়েব সিরিজে। আপনার অভিনীত চরিত্রটি সম্পর্কে যদি কিছু বলেন?

আমি সম্পূর্ণ অন্য ধারার এক চরিত্রে অভিনয় করেছি এই ওয়েব সিরিজে। ব্রিথ-এ আমি এক বাবার চরিত্রে অভিনয় করেছি। আমার সাত বছরের এক ছেলে আছে। তার জীবনমরণ সংশয়। তাই আমাকে জীবনের এক চরম সংকটের সম্মুখীন হতে হয়। একজন বাবা তার সন্তানের প্রাণ রক্ষা করার জন্য কত দূর যেতে পারে, তা দেখতে পাবেন এই ওয়েব সিরিজে। ব্রিথ এক বাবার আবেগময় সফর। সন্তানের প্রাণ রক্ষার্থে সব প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক কাহিনি।

ব্যক্তিগত জীবনে আপনার এক পুত্রসন্তান আছে। কোথাও কি পর্দার বাইরে সন্তানের প্রতি আপনার আবেগ পর্দায় নিয়ে আসতে সাহায্য করেছে?

একদমই না। কারণ ব্রিথ-এ আমার সন্তান খুবই অসুস্থ। আমার মনে হয় না, পৃথিবীর কোনো বাবা বাস্তবে এ ধরনের কঠিন পরিস্থিতির জন্য আগে থেকে প্রস্তুত থাকেন। তাই এই ওয়েব সিরিজে যে আবেগ আমার চরিত্রে ফুটে উঠেছে, এ কারণে আগে থেকে প্রস্তুত ছিলাম না।

কখনো কলেজছাত্র, আবার ফাইটার পাইলট, আবার কখনো সাধারণ চাকরিরত এক যুবক। ভিন্নধারার চরিত্রে আপনাকে দেখা যায়। কীভাবে নিজেকে প্রস্তুত করেন এসব চরিত্রের জন্য?

কিছু কিছু চরিত্রের জন্য বাস্তবের অভিজ্ঞতা খুব সাহায্য করে। থ্রি ইডিয়টস-এ আমি কলেজের ছাত্র ছিলাম। সেই ক্ষেত্রে আমার ছাত্রজীবন আমাকে ‘ফারহান কুরেশি’ হয়ে উঠতে সাহায্য করেছে। রং দে বসন্তি-তে আমি এক ফাইটার পাইলটের চরিত্রে অভিনয় করি। এ ছাড়া এই ছবিতে আমি একজনের সন্তান, একজনের প্রেমিকও। এগুলো আমাকে বাস্তব জীবন থেকে নিতে সাহায্য করেছে। আমি ওম পুরি, কমল হাসান, অমিতাভ বচ্চনের মতো তারকাদের খুব কাছ থেকে দেখেছি। আমি খুবই ভাগ্যবান যে ওনাদের মতো ব্যক্তিত্বের সঙ্গে কাজ করেছি।

ওম পুরি, অমিতাভ বচ্চন, কমল হাসানের কথা আপনি বললেন। এই তিন ব্যক্তিত্ব একে অপরের থেকে কতটা আলাদা, কতটা এক?

আমি এই তিন ব্যক্তিত্বের বিশাল ভক্ত। আমাদের খুব দুর্ভাগ্য যে ওম পুরির মতো অভিনেতাকে আমরা হারিয়েছি। সেটে এসেই ওম স্যার নানান জোকস বলে সবাইকে মাতিয়ে রাখতেন। আসলে এইভাবে উনি সেটে একটা হালকা পরিবেশ সৃষ্টি করতেন। কিন্তু যখন নিজের চরিত্রের মধ্যে ঢুকে যেতেন, তখন অন্য এক মানুষ। আমি ওনার অভিনয় দেখে এতটাই অভিভূত হয়ে যেতাম যে নিজের সংলাপ একেক সময় ভুলে যেতাম। আর কমল স্যার (কমল হাসান) তো ক্যানডি শপ। আমি ওনার সঙ্গে নানান বিষয় নিয়ে আলোচনা করতাম। অমিত স্যারের (অমিতাভ বচ্চন) ব্যক্তিত্ব সবার চাইতে একদম আলাদা। উনি যখন কোথাও যান, মানুষ আপনা থেকেই দাঁড়িয়ে যান। আমি যখন ওনাদের সামনে দাঁড়িয়ে অভিনয় করেছি, সেই মুহূর্তে মাধবনকে একদম ঝেড়ে ফেলে দিয়েছি। আর এই সবকিছু ওনাদের থেকেই শেখা। মাধবনকে, অর্থাৎ নিজেকে বিসর্জন না দিলে আমি এ ধরনের ব্যক্তিত্বের সামনে মাথা তুলে অভিনয় করতে পারব না। নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে পারব না। আর তাঁরাই আমাকে উৎসাহ জুগিয়েছেন এই সবকিছু করতে।

ব্যক্তিগত জীবনে আপনার সঙ্গে ছেলের কী রকম সম্পর্ক?

আমার ছেলের বয়স ১২ এখন। কিন্তু মনের দিক থেকে ও ৪৫ বছরের এক মানুষের মতো। এখনকার প্রজন্ম ভীষণই এগিয়ে। আমার শুধু মনে হয়, ওরা যেন আমাদের বোকামোকে, আমাদের অজ্ঞতাকে মেনে নেয়। তবে এই প্রজন্ম নিজেদের কাজের বিষয়ে ভীষণই স্বচ্ছ। আমার ছেলের সঙ্গে নানান বিষয় নিয়ে আলোচনা করি। আমার মনে হয়, সন্তানকে শুধু প্রথাগত শিক্ষা দেওয়া আমাদের কাজ নয়। তার বাইরে জীবন সম্পর্কে অভিজ্ঞতা দেওয়া প্রয়োজন। আমি সেটাই দেওয়ার চেষ্টা করি। সমাজের নিচু স্তরের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে ওকে সময় কাটাতে দিই। ওদের কতটা সংঘর্ষ করতে হয়, তা আমাদের সন্তানদের জানা প্রয়োজন।আপনার পথই কি অনুসরণ করবে আপনার ছেলে?

আমার ছেলে বেদান্ত খুব ভালো সাঁতারু। রাজ্যস্তরের সাঁতারু ও। খুব মন দিয়ে বেদান্ত এখন সুইমিং করছে। প্রচণ্ড পরিশ্রম করছে। আমার পথ আমার ছেলে অনুসরণ করতেই পারে। তবে আমরা যতই আশা করি না কেন, সবকিছু দর্শকের হাতে। আর এটাই এই ইন্ডাস্ট্রির মজা। তাই তুমি কোন সুপারস্টারের ছেলে বা তুমি কতটা হ্যান্ডসাম—এসব কোনো ম্যাটার করে না। শুধু আমার ছেলেকে এই ইন্ডাস্ট্রির জন্য প্রস্তুত করে দিতে পারি মাত্র। দর্শক তাঁকে কতটা গ্রহণ করবে, তা আমরা কেউ বলতে পারি না। তবে এইটুকু বলতে পারি, বেদান্ত কিন্তু বেশ হ্যান্ডসাম (সশব্দে হেসে)।

এবার একটু অন্য রকম প্রশ্ন করি। ‘থ্রি ইডিয়টস’ ছবির সেই ম্যাজিক্যাল মন্ত্র ‘অল ইজ ওয়েল’ নিজের জীবনের কঠিন পরিস্থিতিতে কখনো প্রয়োগ করেছেন কি?

হা, হা, হা! দারুণ একটা প্রশ্ন। আমি এই মন্ত্রের জন্য রাজুজিকে (রাজ কুমার হিরানি) ধন্যবাদ জানাতে চাই। শুধু জীবনের কঠিন সময়ে নয়, নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্যও এই জাদুমন্ত্র কাজ করে। আমি আমার জীবনে নিত্য এই তিনটি ম্যাজিক শব্দ বলে থাকি। দারুণ ট্র্যাফিকে আটকে গেছি। ফ্লাইট ধরতে হবে। কিছু আমার হাতে নেই। তখন ‘অল ইজ ওয়েল’ বলতে থাকি। অদ্ভুত একটা শক্তি পাই। তাই জীবনের যেকোনো পরিস্থিতিতে এই জাদুমন্ত্র আমি আওড়াতে থাকি।

আপনি ফিল্মের দুনিয়ার মানুষ। ডিজিটাল দুনিয়ায় এলেন। এই দুই দুনিয়া কোথায় আলাদা?

ডিজিটাল একদম অন্য এক জগৎ। এবং কঠিন এক জগৎ। আমাদের বেড়ে ওঠাটা এমনি যে আমাদের কাছে ফিল্মস্টার মানে একদম আলাদা। কোনো মলে গিয়ে যদি দেখেন কোনো বিগ বস প্রতিযোগী এসেছেন, তাঁকে দেখতে কিন্তু সেরকম ভিড় হয় না। কারণ এখানে প্রচুর প্রতিযোগী। বিগ বস, ইন্ডিয়ান আইডলের মতো শোতে এরকম প্রতিযোগী আসছে আর যাচ্ছে। ডিজিটাল মিডিয়া অনেকটাই তাই। এখানেও ৮ থেকে ১০টা অ্যাপিসোড থাকে। আবার অনেক সময় ৫২ পর্বেরও সিরিজ হতে পারে। তবে সিনেমার মতো কখনোই ছোট হতে পারে না। তাই সঠিক কনটেন্ট নির্বাচন করা খুব জরুরি। মাত্র ২ শতাংশ মানুষ থিয়েটারে গিয়ে সিনেমা দেখে। টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রি সেখানে অনেক বড়। ৯ শতাংশ মানুষ প্রাইম সিরিজ দেখে নানান ভাষায়। সেখানে ৩০ শতাংশ মানুষের হাতে ফোন। আট পর্বের জন্য ডিজিটাল মিডিয়ায় যা পরিশ্রম করা হয়, তা তিনটা সিনেমার সমান পরিশ্রম। তবে ফিল্মের সঙ্গে ডিজিটালের সবচেয়ে বড়া তফাত হলো ভাষা। ডিজিটাল মিডিয়ায় আপনার ভাষার ওপর পুরোপুরি দখল থাকা জরুরি। উচ্চারণ সঠিক হওয়া প্রয়োজন। আপনি একজন তামিল অভিনেতা তেলেগু ছবি করলেন, তা হয় না ডিজিটালে। এখানে ডাবিংয়ের কোনো জায়গা নেই। এটা সিরিয়াল নয় যে চলে যাবে। এখানে ফিল্মের মতো মান বজায় রাখতে হবে। ব্যাকগ্রাউন্ডে ট্রেন চলে গেল, কারও মোবাইল বেজে উঠল—এ ক্ষেত্রে তা চলবে না। কারণ মানুষ কানে ইয়ারফোন দিয়ে এর সাউন্ড শুনবে।

ছবি নির্বাচনের ক্ষেত্রে আপনি কোনটায় বেশি গুরুত্ব দেন?

সবার আগে অবশ্যই কনটেন্ট দেখি। এরপর দেখি টাকা। কত টাকা ছবিটা থেকে আয় করতে পারব। অনেক কাজ হয়েছে, এবার পয়সা কামাতে হবে (সশব্দে হেসে)।

এ বছর নতুন কী উপহার দিতে চলেছেন আপনার অনুরাগীদের?

ঈশ্বরের আশীর্বাদে এই বছরে ঠাসা কাজ করছি। দুটি হিন্দি ছবি করছি। একটা বায়োপিক, আরেকটা ছবিতে প্রধান ভিলেনের চরিত্রে অভিনয় করছি। তামিলে তিনটা ছবিতে কাজ করব। গত সাত বছরে আমি কমই ছবি করেছি।

আপনি এখন পঞ্চাশের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। অথচ এখনো প্রধান চরিত্রে অভিনয় করছেন। কী রকম লাগছে?

হ্যাঁ, দুই বছর পর আমার পঞ্চাশ হবে। আমি যখন ৪০-এ পা দিই, তখন আমার মহিলা অনুরাগীরা ভেঙে পড়েন। তবে আজ তাঁরা আবার নতুন করে আমার প্রেমে পড়ছেন (সশব্দে হেসে)। কারণ ৩০-এর তারুণ্য, ৪০-এর চঞ্চলতা এবং ৫০-এর অভিজ্ঞতার সংমিশ্রণে নতুন এক ‘মাধবন’ জন্ম নিয়েছে। আর এই মাধবন অনেক বেশি আকর্ষণীয়। সেই মহিলা অনুরাগীরা আজও ‘ম্যাড ফর ম্যাডি’। (সজোরে হেসে)

অভিনেতা হিসেবে নিজের সম্পর্কে মূল্যায়ন কী?

মূল্যায়ন তো দর্শক করবে। তবু আমি বলছি। আমি কখনোই অভিনেতা হিসেবে জন্মায়নি। আমি ধীরে ধীরে অভিনেতা হয়েছি। আর আমি কোনো চরিত্রের জন্য আগে থাকতে প্রস্তুতি নিই না। সেটে গিয়ে ধীরে ধীরে সেই চরিত্র হয়ে উঠি। আমি চরিত্রের গভীরে গিয়ে কাজ করি না। একটা হিন্দি ছবিতে ভিলেনের চরিত্রে কাজ করছি। এ কারণে ওয়ার্কশপ করতে হচ্ছে। কিন্তু আমি এসবে বিশ্বাসী নই। আমি আগেই বলেছি, অমিতাভ স্যার, কমল স্যার, ওম পুরি স্যার এই তিন স্যারের প্রভাব আমার অভিনয়জীবনে। তাঁদের দ্বারাই আমি অনুপ্রাণিত।

Leave a Reply

৯৭/৩/খ, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬
মোবাইলঃ ০১৭১২-৬৪৩৬৭৩, বার্তা বিভাগঃ ০১৭১২-৬৪৪৩৫০, সার্কুলেশন বিভাগঃ০১৯১৬০৯৯০২০
ইমেইলঃ [email protected], [email protected]

সম্পাদক:
মোঃ সুলতান চিশতী

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ
মহসিন হাসান খান (বুলবুল)

নির্বাহী সম্পাদকঃ
মোঃ ইব্রাহিম হোসেন

সহকারী সম্পাদকঃ
মোঃ আতোয়ার হোসেন

আইন উপদেষ্টাঃ
শাহিন সরকার


.: Developed By :.
Great IT