১৩ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ২৯শে কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, হেমন্তকাল

আমরা সবাই বর্ণবাদী!

প্রকাশিতঃ আগস্ট ৪, ২০১৮, ১১:৩৫ পূর্বাহ্ণ


১.
হাসান ও তার তিন বন্ধু বেড়াতে এসেছেন নিউইয়র্কে। উড়োজাহাজ থেকে নামার পর যখন ইমিগ্রেশনে গেল তখন বাঁধল বিপত্তি। হাসানের তিন বন্ধু খুব সহজেই ইমিগ্রেশনের বাধা পার হয়ে বাইরে বসে আছে। কিন্তু হাসানকে আটকে রেখেছে ইমিগ্রেশন পুলিশ। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করার পর হাসানকে যখন ইমিগ্রেশন ছেড়ে দিল, তখন জানা গেল হাসানকে এত জিজ্ঞাসাবাদের কারণ।
হাসানের নামের সঙ্গে মোহাম্মদ আছে, সে একজন মুসলিম। আর হাসান নামে একজন আইএস জঙ্গি আছে। শুধু নামের সঙ্গে মোহাম্মদ আর মুসলিম বলে হাসানকে পাঁচ ঘণ্টা প্রশ্নে জর্জরিত হতে হলো।

২.
আরিফরা পাঁচ ভাই। আরিফ সবার ছোট, বয়স ৩০। ব্যবসার কাজে একবার সিলেট থেকে বগুড়া বেড়াতে গিয়ে একটা মেয়েকে পছন্দ হয়, তারপর দুজনে বিয়ে করে। আরিফের বড় চার ভাই উচ্চশিক্ষিত। আরিফ নিজেও মাস্টার্স শেষ করে ছোটখাটো ব্যবসা করছে। আরিফের স্ত্রীকে মেনে নিচ্ছেন না পরিবার, একমাত্র কারণ মেয়ে সিলেটী নয়, আরিফের স্ত্রীর জন্ম বগুড়ায়। সিলেট নয়, এজন্য পরিবারের কেউ মেনে নিচ্ছেন না। পরিবারের সবাই উচ্চশিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও শুধু ছোট ভাইয়ের বউ সিলেটী নয় বলে কেউ এই মেয়েকে বাসায় আসতে দেবেন না।

৩.
শিহাব নিউইয়র্কের কুইন্সে দীর্ঘদিন যাবৎ বসবাস করছেন। আগে ছিলেন একা। এখন বাবা-মা এবং স্ত্রীও চলে এসেছে, কুইন্সে বাসা ভাড়া অনেক বেশি আর ছোট্ট বাসায় সবাইকে নিয়ে বসবাস করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। বাসা পাচ্ছেন, কিন্তু সবকিছু মিলিয়ে হচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত অনেক খোঁজাখুঁজির পর ব্রঙ্কসে একটা বাসা পেলেন। পরিবারের সবার খুব পছন্দ হয়েছে নতুন বাসা, সবকিছু ঠিকঠাক। সবাই খুশি নতুন বাসায় যাবেন। অগ্রিম কিছু টাকাও ব্রোকারকে দেওয়া হয়েছে। যেদিন বাসা ভাড়ার চুক্তিতে স্বাক্ষর করবেন সে দিন বাসার মালিক বললেন, তাঁকে বাড়ি ভাড়া দেওয়া যাবে না। শিহাব কারণ জানতে চাইলে বাসার মালিক কোনো উত্তর দিলেন না। শুধু বললেন, ‘আমি আপনাকে বাসা ভাড়া দেব না, এটা আমার ইচ্ছা।’ শিহাব মন খারাপ করে যখন বাসায় যাচ্ছে তখন মনে হলো, কেন ভাড়া দেবে না সেটা তাঁকে জানতেই হবে। গাড়ি ঘুরিয়ে আবার ব্রোকারের কাছে গেলেন শিহাব। অনেক অনুরোধ করার পর ব্রোকার বললেন, আপনাকে বাড়ির মালিক সরাসরি কথা বলেননি। আসল ঘটনা হচ্ছে, উনি নোয়াখালীর মানুষকে পছন্দ করেন না। আপনাদের ভাষা আর মালিকের ভাষা এক না। নোয়াখালীর মানুষকে নিয়ে নাকি অনেক সমস্যা। তাই নোয়াখালীর মানুষকে বাসা ভাড়া দেবেন না। আপনার বাড়ি নোয়াখালী, তাই আপনার সঙ্গে হবে না। শিহাবের ইচ্ছা হয়েছিল কষে মালিকের গালে একটা চড় মারতে। কিন্তু এটা সম্ভব না।
শুধু বাড়ি নোয়াখালী বলে তিনি বাসা ভাড়া পাননি।

৪.
ইয়াছিনের বাড়ি রাজধানী ঢাকায়। দুই বছর হল আমেরিকা এসেছেন। কাজ করেন নিউইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্টের ট্রাফিক এজেন্ট হিসেবে। ব্যাখ্যা ছাড়া অদ্ভুত কারণে তিনি সিলেটী মানুষকে পছন্দ করেন না। আমেরিকায় নোয়াখালী ও সিলেটী মানুষ সবচেয়ে বেশি সফল। অবশ্য সংখ্যায়ও তাঁরা সবচেয়ে বেশি। পবিত্র রমজান মাসে ইয়াছিন একবার সিলেটী কিছু মানুষের সঙ্গে ইফতার করছেন জ্যাকসন হাইট্‌সের একটা রেস্টুরেন্টে বসে। খাবার মাঝখানে সিলেটী, অ-সিলেটী নিয়ে তুমুল ঝগড়ার একপর্যায়ে ইয়াছিন বলেই দিলেন, আমরা সবাই ভালো জায়গায়। আর দেখেন আমরা কোথায় যাই। আর আপনারা এরকম ড্রাইভার হয়েই থাকবেন। যে রেস্টুরেন্টে বসে এত স্বাদের কাচ্চি বিরিয়ানি খাচ্ছেন (ঢাকা গার্ডেন), এটিও একজন অ-সিলেটির। কিছুক্ষণ পর রেস্টুরেন্টের ব্যবস্থাপককে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, ভাই এই রেস্টুরেন্টের মালিক সিলেটী। ইয়াছিন তখন এমন আচরণ করছিলেন, পারলে তিনি মুখ থেকে কাচ্চি বিরিয়ানি উগলে ফেলেন। টাকা দিয়ে ইয়াছিন সঙ্গে সঙ্গে বের হয়ে গেলেন।
যে গ্রোসারি বা রেস্টুরেন্টের মালিক সিলেটী, সেখান থেকে কেনাকাটা করা যাবে না বা খাওয়া যাবে না। অদ্ভুত সব যুক্তি দিয়ে সিলেটীদের অপছন্দ করা। ইয়াছিনের মতো আর অনেক আছেন যারা সিলেটীদের অপছন্দ করেন নির্দিষ্ট কোনো কারণ ছাড়া।

ওপরের প্রথমটার সঙ্গে আমরা সবাই একমত যে, সেটি একটা বর্ণবাদী আচরণ। কিন্তু বাকি ৩টি কি?
তাহলে বর্ণবাদ কি? একটু জেনে নিই!
বর্ণবাদ কখনো গায়ের চামড়ার রং দিয়ে হতে পারে, কখনো আঞ্চলিকতা দিয়ে হতে পারে, কখনো গোত্র দিয়ে হতে পারে আবার কখনো বর্ণ দিয়ে হতে পারে। কিছু কিছু সংজ্ঞা অনুসারে, কোনো মানুষের আচরণ যদি কখনো তার জাতি বা বর্ণ দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হয়, সেটি অন্য কারও জন্য ক্ষতিকর না হলেও তাকে বর্ণবাদ বলা হবে। অন্যান্য সংজ্ঞায় শুধু বর্ণবাদ দিয়ে প্রভাবিত হয়ে শোষণ এবং অত্যাচার করাই বর্ণবাদ। (উইকিপিডিয়ার)
বর্ণবাদ হচ্ছে সেই দৃষ্টিভঙ্গি, যা নির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্যের জন্য কোনো জাতিগোষ্ঠী উঁচু অথবা নিচু; কোনো জাতিগোষ্ঠী বেশি যোগ্য অথবা অযোগ্য; কোনো জাতি গোষ্ঠী অন্য গোষ্ঠীর ওপর কর্তৃত্ব করার অধিকারী। মোটকথা বর্ণবাদ হলো বৈষম্যমূলক সামাজিক স্তরবিন্যাস। অথচ আমরা বুঝি না, আঞ্চলিকতাও এক ধরনের বর্ণবাদী আচরণ।

আমরা যারা আমেরিকায় বসবাস করি, তারা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বর্ণবাদী বলে গালি দিই। অথচ আমাদের সবার ভেতরে বর্ণবাদ বিরাজ করছে।
একজন সিলেটী যখন বলে তার দেশ সিলেট তখন আপনি অট্টহাসি দেন, মুর্খ বলে গালি দেন। আরে ভাই আপনি যখন জিজ্ঞাসা করবেন তখন সেতো বলবেই সিলেট। এইটা বোঝেন না? তাকে কি একজন আমেরিকান জিজ্ঞাসা করছে দেশ কই? আমি কাজের সময় অনেক আমেরিকানকে জিজ্ঞাসা করি, Where are you from? তারা সহজভাবে উত্তর দেয় I am from California.
নোয়াখালীর মানুষের ভাষা বুঝি না, তাই তাদের সঙ্গে হবে না। একজন মানুষ খারাপ হতে পারে, তাই বলে পুরো নোয়াখালীর মানুষ খারাপ হয়ে গেল?
মানুষের জন্ম কোথায় হবে, এটা সৃষ্টিকর্তা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। জন্ম বগুড়া বলে মেয়ে খারাপ আর জন্ম সিলেট বলে মেয়ে ভালো হবে—এই ধারণা কি বর্ণবাদী আচরণ নয়?
হাসানের সঙ্গে যা হয়েছে তার সঙ্গে আমরা সবাই একমত হব যে, এটি একটা বর্ণবাদী আচরণ। আর গালি দেব ইমিগ্রেশন পুলিশকে অথচ আমরা সবাই কি বর্ণবাদী নয়?
আমি একজন উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও বিয়ে করার সময় আঞ্চলিকতা দেখি। চলাফেরা করার সময় খুঁজি সে কোন বংশের, কোন জাতের।
আমার নিজের অঞ্চলের প্রতি আমার ভালোবাসা থাকবে, তাতে দোষের কিছু নয়, তাই বলে অন্য অঞ্চলের মানুষদের ছোট করে দেখব?

নিউইয়র্কে একই জেলার কয়েকজন মিলে গঠন করা হয় সামাজিক সংগঠন। বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান (বিশেষ করে বনভোজন) আমন্ত্রিত অতিথি—সবাই থাকেন ওই জেলার। এখন যদি আপনি এই জেলার না হন, তাহলে আপনি বনভোজনে যেতে পারবেন না। ওই জেলার নয় বলে বিনোদন, সহমর্মিতা আর ভালোবাসা গড়ে উঠতে পারে না? ওই জেলার নয় বলে আমার অধিকার নেই বনভোজনে যাওয়ার?
তারপর দেখা যায়, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব থেকেই একই জেলায় বিবদমান পক্ষ আলাদা সংগঠন করে। বিভিন্ন সংগঠন গড়ে ওঠাতে সাধারণ মানুষ পড়ে যায় বিপাকে। কোনটি ছেড়ে কোনোটিতে যাবে! সিলেট বিভাগে জেলা আছে ৪টা। এই চার জেলার মধ্যে শুধু সিলেট জেলারই নিউইয়র্কে সংগঠন আছে অন্তত ১০টি। এভাবে নামে বেনামে কত শত সংগঠন আছে নিউইয়র্কে, তার হিসাব নাই। প্রায় সব কয়টি বিভাগীয় শহর-উপশহর, জেলা-উপজেলা, থানা এবং গ্রাম নামে একের অধিক সংগঠন সমিতি আছে। আমেরিকায় অন্যান্য দেশ ও জাতির আরও বেশি মানুষ থাকলেও সভা-সমিতি ও সংগঠনের দৌড়ে বাংলাদেশিরা সবার ওপরে।
আমরা ইচ্ছা করেই নিজেরাই বিভক্ত হচ্ছি।

আমাকে যখন মুসলিম বলে পুলিশ সন্দেহের চোখে দেখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রাখে তখন আমি যুক্তি দেখাই, একজন সন্ত্রাসী বলে সব মুসলমান কি সন্ত্রাসী? অথচ এই আমিও বুঝি না, একটা অঞ্চলের একজন লোক খারাপ বলে সবাই খারাপ হয়ে গেল?

পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি বর্ণবৈষম্য (অবহেলিত, নির্যাতিত, বঞ্চিত) গায়ের রং দিয়ে অর্থাৎ কালো আর সাদা চামড়ার মানুষের মধ্যে। কালো আর সাদা চামড়ার মানুষ নিয়ে বর্ণবাদ সবচেয়ে বেশি হয়েছিল আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকায়।

আমেরিকায় এখনো এই বর্ণবাদ প্রতিষ্ঠিত। এদেশে এই বর্ণবাদী আচরণ সমাজে প্রতিষ্ঠিত, সবাই জানে এবং প্রচার করে। এই বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সবাই কথা বলে, সবাই কথা বলে সমাজের কুসংস্কার দূর করার জন্য। ইউটিউবসহ সব সামাজিক মাধ্যমে প্রায় প্রতিনিয়ত বর্নবাদের বিরুদ্ধাচার হয়।
আর আমরা আঞ্চলিকতায় বিভক্ত হয়ে প্রতিদিন যে বর্ণবাদী আচরণ করছি, তার বিপক্ষে কেউ কথা বলে না! কেউ কথা বলার নাই! কারণ আমরা সবাই বর্ণবাদী। হ্যাঁ, আমরা সবাই বর্ণবাদী, আর এটাই হচ্ছে বাস্তবতা।

Leave a Reply

৯৭/৩/খ, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬
মোবাইলঃ ০১৭১২-৬৪৩৬৭৩, বার্তা বিভাগঃ ০১৭১২-৬৪৪৩৫০, সার্কুলেশন বিভাগঃ০১৯১৬০৯৯০২০
ইমেইলঃ [email protected], [email protected]

সম্পাদক:
মোঃ সুলতান চিশতী

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ
মহসিন হাসান খান (বুলবুল)

নির্বাহী সম্পাদকঃ
মোঃ ইব্রাহিম হোসেন

সহকারী সম্পাদকঃ
মোঃ আতোয়ার হোসেন

আইন উপদেষ্টাঃ
শাহিন সরকার


.: Developed By :.
Great IT