১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ৪ঠা আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, শরৎকাল

আত্মশুদ্ধির মাস রমজান

প্রকাশিতঃ মে ১৯, ২০১৮, ১১:২২ পূর্বাহ্ণ


মাহে রমজানুল মোবারক। রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। যা কিছু কল্যাণকর, তার সঙ্গে এ মাসের রয়েছে গভীর সম্পর্ক। এ মাসেই নাজিল হয়েছে আল কোরআন, যা মানবজাতির জন্য পথপ্রদর্শক। এটি এমন মাস, যাতে মুসলমানরা নিজেকে পরিশুদ্ধ করার সুযোগ পায় এবং এর মাধ্যমে মহান আল্লাহ তায়ালার সান্নিধ্য লাভের সুযোগ হাসিল করে। মহান আল্লাহ তায়ালা তার বান্দাদের ওপর এতটাই উদার হয়ে যান, তাদের ক্ষমা প্রার্থনাকে সহজেই মঞ্জুর করে নেন। সময়ের আবর্তে আরবি সনের এগারোটি মাস অতিক্রম করে আমাদের কাছে হাজির হয়েছে আত্মশুদ্ধির মাস মাহে রমজান। এ মাস নিজেকে পরিশুদ্ধ করার অন্যতম সময়। সব মাসের সেরা এ মাস।

কৃচ্ছ্রসাধনা, ত্যাগ, সংযম এবং পরহিতৈষণার মহান বার্তা নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হয়েছে হিজরি সনের নবম মাস মাহে রমজান। এ মাসকে মহান আল্লাহ তায়ালা জাল্লা শানহু সিয়াম পালনের মাস হিসেবে নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। এ মাসের প্রতিটি ক্ষণ-অনুক্ষণ আল্লাহ তায়ালার খাস রহমতে পরিপূর্ণ। এ মাস এক অসাধারণ মাস। নিঃসন্দেহে এ মাস স্বতন্ত্র ও মাহাত্ম্যের দাবি রাখে। গোটা মুসলিম জাহানে রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস মাহে রমজানের কঠোর সিয়াম সাধনা শুরু হয়। দীর্ঘ এক মাসব্যাপী রমজানের কঠোর পরিশ্রম ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে আল্লাহর তাকওয়া অর্জন ও এর সামগ্রিক সুফল সমাজের সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে পারলে বিশ্বব্যাপী মানবতার শান্তি ও সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত হবে। রমজানের রোজা সাধনার মাধ্যমে মানুষের অন্তরের রিপুকে আল্লাহর তাকওয়া অর্জনের মাধ্যমে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে নিশ্চিত করা হয়। অন্তরের পশুপ্রবৃত্তি তথা নফসে আম্মারাকে বশীভূত করে মানুষ নফসে লাওয়ামা ও নফসে মুতমাইন্নার (সর্বোচ্চ প্রশান্ত আত্মা) পর্যায়ে উপনীত হয়। প্রকৃত রোজাদার তাই এ মাসে আত্মশুদ্ধি ও আত্মসংশোধনের পর্যায়ে উপনীত হয়। আত্মশুদ্ধি ও আত্মসংশোধনের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে। আর সত্যিকার সিয়াম সাধনার মাধ্যমে সমাজ থেকে সব অন্যায়, অনাচার, ব্যভিচার ও সন্ত্রাস দুরীভূত হয়। গোটা ব্যক্তিজীবনে নিরাপদ ও নির্বিঘেœ জীবনযাপনের নিশ্চয়তা লাভ করা যায়।
প্রত্যেক সবল মুসলমানের জন্য রমজান মাসের রোজা রাখা ফরজ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, ‘হে মোমিনগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর। যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পার।’ (সূরা বাকারা : ১৮৩)। মাহে রমজানের এই পূর্ণময় সময়ে সিয়াম সাধনা বা রোজাব্রত পালন মানবজীবনকে পূতপবিত্র ও ইসলামি নীতিনৈতিকতায় গড়ে তোলার এক অপূর্ব সুযোগ। এ মাসে যারা একনিষ্ঠভাবে রোজা রেখে নিজেকে আত্মশুদ্ধির পর্যায়ে নিয়ে যায়, তার চূড়ান্ত ফল মহান প্রভু আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি ও অপার করুণার দৃষ্টি। মানুষের আত্মশুদ্ধির একটি বলিষ্ঠ হাতিয়ার সিয়াম সাধনা করা। এ মাসের রোজা রাখার মধ্য দিয়ে একজন মুসলমান তার পাশবিক প্রবৃত্তিকে সংযত এবং নিজের আত্মিক অন্তর্গত সত্তাকে জাগ্রত ও বিকশিত করে তোলার পরিপূর্ণ সুযোগ লাভ করে। মানুষের হৃদয়ে যে পশুসুলভ ভাব রয়েছে, তা তার আত্মিক সত্তাকে জাগ্রত করতে অন্তরায়। মানুষ যখন এই দুষ্টশক্তির ওপর আত্মিক ও বিবেকের রাজত্ব সৃষ্টি করতে পারে, তখনই সে পরিপূর্ণতার দিকে এগিয়ে যায়।
কুপ্রবৃত্তির হাতিয়ারকে বশে আনার জন্য মহান প্রভু আল্লাহ তায়ালা রমজানের রোজা পালন করার অপূর্ব সুযোগ দিয়েছেন। মানুষ যাতে তার কুপ্রবৃত্তিকে পরাজিত করে ধর্মীয় অনুশাসন সঠিকভাবে পালন করতে পারে এবং যাবতীয় অকল্যাণকর কর্মকা- থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে আল্লাহর রহমত পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হতে পারে।
আত্মাকে সংশোধন, রিপুর লোভলালসা, দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা ইত্যাদি পরিমার্জন ও পরিশোধনের মাধ্যমে একজন সিয়াম পালনকারী সফলকাম হতে পারেন। আল্লাহ বলেন, ‘শপথ আত্মার এবং যিনি সুঠাম করেছেন তার, অতঃপর তাকে পাপাচারের ও ধার্মিক পথ শিক্ষা দিয়েছেন, সুতরাং সে সফলকাম, যে আত্মশুদ্ধি অর্জন করে। আর সে-ই ব্যর্থ, যে নিজেকে কলুষিত করে। (সূরা আশ শামস : ৭-১০)।
আত্মা মানুষকে পাপ পথে চলার নির্দেশনা দেয়। সিয়াম পালনকারীদের নিজ আত্মাকে সৎপথে পরিচালিত করার মাধ্যমে কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধাচরণ হবে। হৃদয় যদি গোনাহের পথে ডাকে, তাহলে সেই ডাকে সাড়া দেওয়া যাবে না। বরকতময় মাহে রমজানে সর্বদা হৃদয়কে কুচিন্তা থেকে ফিরিয়ে রাখতে হবে। মানবাত্মাকে সংশোধন করা হলেই আপনা-আপনি ইবাদতে সত্যনিষ্ঠা ও উৎসাহ বেড়ে যাবে। আর এই পরিশুদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে লোভলালসা, কামনাবাসনা, রিপুর চাহিদা, অপরের সম্পদ আত্মসাৎ, অন্যায়-অবিচার, অসামাজিক দুবৃত্ততা পরিহার করে ধার্মিকতার পথে একধাপ এগিয়ে যাবে। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পরহেজগার তাকওয়ালা হওয়া প্রত্যেক মুসলিমের জন্য একান্ত জরুরি ও বাঞ্ছণীয়। বর্ণিত হয়েছে, ‘যে সংশোধিত হলো, সে সফলকাম হলো।’ (সূরা আল-আলা : ১৪)।
আত্মার কুপ্রবৃত্তিগুলো সবল ও সজীব থাকলে সুপ্রবৃত্তিগুলো নির্জীব হয়ে যায়। মানুষের ঈমানের ভিত্তি দুর্বল হয়ে গেলে শয়তান তার ওপর প্রভাব ফেলতে কোনো অসুবিধা হয় না। আর এ যাবতীয় মন্দ কাজ থেকে রক্ষা করার জন্য রোজা হচ্ছে ঢালস্বরূপ। ফরমানে মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হচ্ছে, ‘রোজা ঢালস্বরূপ।’
রোজা পালনের মাধ্যমে মানুষ নিজেকে আত্মশুদ্ধির পথে পরিচালিত করে। মহান আল্লাহ তায়ালা আত্মশুদ্ধির জন্য দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। বর্ণিত হয়েছেÑ ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা করো, বিশুদ্ধ তওবা। হয়তো তোমাদের প্রভু তোমাদের খারাপ কর্মগুলো মোচন করে দেবেন।’ (সূরা আত তারহিম : ৮)।
রোজা সাধনার মাধ্যমে মানুষ এক অমিয় সুধা লাভ করতে পারে। এর ফলে মানুষ জাগতিক লোভলালসা, সম্পদ, টাকাপয়সা, বাড়ি-গাড়ি অর্জনের ধ্বংসকারী ব্যাধি থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার সুযোগ লাভ করে। হৃদয়কে নির্মল বা আত্মশুদ্ধির অস্ত্রের মূল শক্তি সঞ্চারিত হয় রোজা পালনের মাধ্যমে। মানুষ কোনো মন্দ কাজ কিংবা দোষত্রুটির কর্ম সাধন করে, তখন তার হৃদয়ে কালিমা বা মরিচার জং ধরে। এই পাপের মরিচা থেকে হৃদয়কে শুদ্ধি তথা পরিষ্কার করনে একমাত্র পন্থা হলো আল্লাহকে স্মরণ করা। মানুষ যতই আল্লাহর জিকির, ইবাদত, নামাজ, রোজা পালন করবে, ততই তার হৃদয় পরিশুদ্ধ হতে থাকবে এবং সে পাপ কালিমা থেকে মুক্ত হবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, ‘আর তিনিই তাঁর বান্দাদের তওবা কবুল করেন এবং পাপগুলোকে ক্ষমা করে দেন।’ (সূরা আশ সূরা : ২৫)।
মাহে রমজান হচ্ছে, সবরের মাস। মানুষ তার কথাবার্তায়, আচার-আচরণে, কর্মে ও চলাফেরা যাবতীয় পর্যায়ে সবরের মাধ্যমে রোজা সাধনার পরিপূর্ণ লাভ করে। রমজান মাসে রোজাদার ব্যক্তি কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সবর করলে সব ধরনের পাপ, পানাহার, স্ত্রী সম্ভোগ থেকে বিরত থাকেন। এটি সমবেদনা জানানোর মাস। এই মাসে প্রত্যেক মোমিন বান্দাদের রিজিক বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এ মাস ধৈর্য ধারণের মাস। ধৈর্যের বিনিময়ে নির্ধারিত রয়েছে সুশীতল ছায়ানীড় জান্নাত। ফরমানে মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হচ্ছে, এটা সবর বা ধৈর্যের মাস। আর সবরের বিনিময় হচ্ছে জান্নাত। (মিশকাত)।
মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর অসীম দয়া ক্ষমা ও পরিত্রাণ প্রাপ্তির জন্য মাসব্যাপী রোজা নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। যাতে আত্মসংযমের মাধ্যমে বান্দারা আত্মনিয়ন্ত্রণ ও পরিশুদ্ধি অর্জন করতে পারে। প্রকৃত রোজা পালনকারীরা এই মাহে রমজান নামক রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের দরিয়ায় অবগাহন করে এগারো মাসের পুঞ্জীভূত পাপ কালিমা থেকে মুক্তি ও পবিত্র হতে পারে।
যারা সতর্ক ও জ্ঞানী, তারা এই সুবর্ণ সুযোগ সঠিকভাবে ব্যবহার করে মহান আল্লাহ তায়ালার দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকে এবং দয়াময় আল্লাহ তায়ালা তাদের নিরাশ করেন না।
রোজা পালনকারী সব ধরনের গোনাহের কাজ থেকে নিজেকে বিরত রেখে মহান আল্লাহর নির্দেশে নবীর প্রদর্শিত পথে চলার এক সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে থাকে।
সংযত ও নিষ্ঠাবান হওয়ার যে শিক্ষা মাহে রমজানে রয়েছে, আমরা যেন ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে আমল করতে পারি। আমিন।

Leave a Reply

৯৭/৩/খ, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬
মোবাইলঃ ০১৭১২-৬৪৩৬৭৩, বার্তা বিভাগঃ ০১৭১২-৬৪৪৩৫০
ইমেইলঃ [email protected], [email protected]

সম্পাদক:
মোঃ সুলতান চিশতী

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ
মহসিন হাসান খান (বুলবুল)

নির্বাহী সম্পাদকঃ
মোঃ ইব্রাহিম হোসেন

সহকারী সম্পাদকঃ
মোঃ আতোয়ার হোসেন

আইন উপদেষ্টাঃ
শাহিন সরকার


.: Developed By :.
Great IT